সালমা খানম
সকাল থেকে ধুন্ধুমার কাণ্ড। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। জোবেদা বেগমের একটা সেমিনারে এ্যাটেন্ড করতে হবে। রাত জেগে একটা লেখা তৈরিও করেছেন। গৃহকর্মী নাজমা আজ জ্বর নিয়েও সকাল সকালই কাজে এসেছে। নাজমা, জোবেদা বেগমকে চা দিতে দিতে বললো, আফা! আইজকা নাকী আমগোর দিন। টি.ভি.তে বলতাছে।
জোবেদা বেগম পরেছেন নীল বেগুনি কালারের একটা জামদানি। নাজমার কথায় হেসে ফেললেন। বললেন, হ্যাঁ, আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
: হেইয়া দিয়া কী করে গো আফা! আইজও তো আমার জামাই আমারে মাইরা দইরা, গালাগালি কইরা কাজে গ্যালো। কইলো, এত বীমার অইলে হ্যায় আবার বিয়া করবো।
জোবেদা বেগম থমকালেন। চিন্তিত গলায় বললেন, তোরাই তো লাই দিয়ে জামাইদেরকে মাথায় তুলে রাখছিস। এক ঘা খেলে দুই ঘা বসিয়ে দিবি। তোর গায়ে জ্বর, আর তোকে এভাবে মারতে পারলো!
নাজমা কথার উত্তর না দিয়ে হাতের কাজ মনোযোগ দিয়ে করতে থাকলো। হঠাৎই মুখ তুলে বলল,
মাইরের বদলা মাইর তো সমাধান না আফা। মানুষটা যদি খালি আমারে ভালোবাইসতো, তাইলে মাইরের মধ্যিও আমার সুখ আছিলো গো আফা। আচ্ছা, কন তো আফা, বেডা মানুষগুলা এমুন কুত্তার লাহান ভেহাংড়া অয় ক্যান্?
জোবেদা বেগম বললেন, তোর এই কথাগুলো আজ সেমিনারে তুলবো। শোন, সব কাজ গুছিয়ে সেরে, বড় ভাইয়াকে ঘুম থেকে তুলে, চা দিয়ে তারপর যাস। আর দেরাজে টাকা রাখা আছে, নিয়ে যাস। অবশ্যই ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ খাবি। স্বামীর জন্য নয়, নিজের জন্য বাঁচবি।
জোবেদা বেগম আজ একা যাচ্ছেন না, সাথে তার স্বামী রাইসু রাসেলও যাচ্ছেন। তিনি বিশিষ্ট শিল্পপতি। গাড়ীতে উঠতে উঠতে রাইসু কিছুটা তাচ্ছিল্য সহকারে বললেন, কী ফালতু জামদানি শাড়ী পরেছ! বি স্মার্ট ডিয়ার। মিসেস ফারুকের গেট আপ দেখেছ, জিনস্ আর ফতুয়া। ঝরঝরে ফিগার, টান টান কথাবার্তা। সবসময় ড্যাম স্মার্ট।
গাড়ীতে উঠে সীট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে জোবেদা বেগম বললেন, আমার নারীসত্ত্বাকে আমি শ্রদ্ধা করি, আমার বাঙালি ঐতিহ্যকে আমি লালন করি, তোমার ভালো না লাগলে সেটা তোমার সমস্যা।
রাইসু রাসেল বললেন, তোমাদের সাথে আরও একজন আছেন, কী যেন নাম, হ্যাপী তিনিও কিন্তু পশ্চিমা পোশাকে দারুন আবেদনময়ী।
এবার একটু রেগে গেলেন জোবেদা। রাগটাকে সামলে নিয়ে বললেন, তুমি কী নারীদের এমন শরীরের ভাঁজ দেখতেই এসব অনুষ্ঠানে যাও? অথচ, সবাই তোমায় কতইনা শ্রদ্ধা করে!
রাইসু বললেন,
তোমরা জানো, ৬৫% পুরুষই লম্পট। তারপরও শরীর দেখাবা, আমরা দেখবো না, এটা হয়?
জোবেদা হঠাৎই তার শিক্ষা, রুচি সব ভুলে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, লজ্জা করেনা তোমার, আমার সামনে এমন নির্লজ্জভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে?
রাইসু মুখ বিকৃত করে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
ছোটলোকের মতো চিৎকার করবে না। নারীর অধিকার!(এইখানে তিনি একটা ছোট গালি দিলেন) তুমি আর একটা কথা বললে গাড়ী থেকে নামিয়ে দেবো।
জোবেদা বেগম দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। ড্রাইভার সব শুনছে। নিজের মনটাকে অন্যদিকে নেবার জন্য তিনি গতকাল রাতে সেমিনারে দেবার জন্য যে বক্তব্যটি তৈরি করেছিলেন, সেই পেপারটি চোখের সামনে মেলে দিয়ে মুখটি আড়াল করলেন। বক্তব্যের একটি জায়গায় তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার (রাঃ) এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেই ঘটনাটি তিনি আবার পড়লেন।
একজন দর্শনার্থী হযরত উমার (রাঃ) এর কাছে এসেছেন, তার স্ত্রী তার সাথে সারাক্ষণ ছোটোখাটো বিষয় নিয়েও তার সাথে ঝগড়া করে, এর বিহিত বিধান কী হতে পারে, তা জানার জন্য। কিন্তু এসে তিনি দেখলেন, অথবা শুনলেন, হযরত উমার (রাঃ) এর স্ত্রী খলীফাকে একচেটিয়া অনেক অভিযোগ করে যাচ্ছেন। কিন্তু খলীফা কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ শুনে যাচ্ছেন। এসব দেখেশুনে তিনি যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন খলীফা বাইরে এসে তার সমস্যা জানতে চাইলেন। সেই দর্শনার্থী সব খুলে বললেন। মৃদু হেসে খলীফাহ্ বললেন,
আমরা পুরুষরা কতকিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আমাদের নিজস্ব পরিচয়, নিজের কোনওকিছুই বিয়ের পর আমরা বদলাই না। আর স্ত্রীগণ তাদের মা, বাবা আত্মীয়-স্বজন তাদের পরিচিত জগত সবকিছু ছেড়ে এসে, আমাদের সাথে আমাদের আনন্দ বেদনায়, আমাদের সন্তান ধারণ, লালন-পালনে তাদের সারাটা জীবন কাটিয়ে দেন। তাই তারা যদি একটু কটমট করে কিছু বলেও, পুরুষ হিসেবে সেটা সহ্য করা আমাদের জন্য কর্তব্য।
এই পর্যন্ত পড়ে জোবেদা থামলেন। তিনি গাড়ী থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ড্রাইভারকে গাড়ী থামাতে বললেন। রাইসু রাসেল বললেন,
একটা কথাও বলবেনা। মোটেই সিনক্রিয়েট করবেনা। একটা কথা বললে এমন মার খাবে যে অনুষ্ঠানেই যেতে পারবে না।
জোবেদা বেগম কাঠ হয়ে গাড়ীতে বসে রইলেন।
যথাসময়ে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে জোবেদা যখন গাড়ী থেকে নামছিলেন, তখন দেখলেন, একটা চারচাকার ঠেলাগাড়িতে একজন অন্ধ পুরুষ বসে আছে। গাড়িটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একজন নারী। তার বাম হাতের কনুই থেকে বাকী অংশ নেই। তারা গান গেয়ে ভিক্ষা চাইছে। সুরটা এবং গানের গলা ভারি মনকাড়া। জোবেদা বেগম নিজের অজান্তেই তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। নারীটির কাছে জানতে চাইলেন, এই পুরুষটি আপনার স্বামী? তিনি কী জন্মান্ধ?
নারীটি গান থামিয়ে বললেন,
না, হ্যায় আছিলো পকেটমার। একবার পকেট মারতে গিয়া ধরা পইড়া পাবলিকে হ্যার চোখ তুইল্লা নিছে। আমি ঠেকাইতে গিয়া কোপ খাইয়া বাও হাতখান হারাইছি।
জোবেদা বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, আপনি কেন ঠেকাতে গেলেন?
নারীটি এবার বিরক্ত কণ্ঠে বললেন,
আফা, কিছু সাইয্যো দিলে দেন, নয় রাস্তা মাপেন, আজাইরা প্যাচালের সময় নাইক্ক্যা। সোয়ামী জানোয়ার অইলে হ্যারে ফালাইয়া দিমু? পরকালে হক্কলেরেই জওয়াব দেওন লাগবো। কুনু ছাড়োন নাই।
জোবেদা মাথা চেপে বসে পড়লেন। আপনমনে অস্ফুটে বলতে থাকলেন, ওহ্ গড! ওহ্ গড!! ওহ্ গড!!!
লুলা নারী এবং অন্ধ পুরুষ ফকিরটি এগিয়ে যাচ্ছে। তারা আবার একতালে গান ধরেছেন,
"এ যে দেখি কানার হাট বাজার"