গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়ে প্রবহমান যমুনা, ঘাঘট ও তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদী অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে গেছে। ফলে এসব নদীতে নৌ চলাচল প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃণ এলাকা বিরান বালুভূমিতে পরিণত হয়ে নদীর গতিপথ পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার ইরি বোরো মৌসুমে নদীনির্ভর সেচ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয়ায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছে।
অন্যান্য বছর বৈশাখ মাস পর্যস্ত নদীগুলোতে পানি থাকলেও এবার পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন। এ বছর ফাল্গুনের শুরু থেকেই অস্বাভাবিকভাবে পানি কমতে শুরু করে। এখন তিস্তা, মমুনা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়াসহ ১৩টি নদী মূলত শুকিয়ে খা খা করছে। চারদিকে চর জেগে বালু আর বালুতে পরিণত হয়েছে।
নদীগুলোর মূল গতিপথের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করলেও বালুভূমির উপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে। নাব্য সংকটের কারণে কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, জামালপুর, সারিয়াকন্দিসহ কয়েক জেলার নদিপথ এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ট্রলার কিম্বা নৌকা- কোনো নৌযানই স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না।
বর্ষাকালে নদীর নাব্য স্বাভাবিক থাকার সময় গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজীবপুর, কর্তিমারী, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ ঘাট, ঘুটাইল, ইসলামপুর পর্যন্ত নৌ চলাচল অব্যাহত থাকে। এখন নাব্য সংকটের কারণে গাইবান্ধার অভ্যন্তরীণ অধিকাংশ রুটেও নৌ চলাচল দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ঘুরে ঘুরে দীর্ঘ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নৌযানগুলোকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হচ্ছে। সে জন্য অনেক রুটে নৌযান চলাচল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চরাঞ্চলের মানুষদের দূরবর্তী এলাকায় যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এক পর্যায় নৌরুটগুলো সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে সেচ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আগে নদীর পানি থেকে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করলেও এখন ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। ফলে চাষাবাদের ক্ষেতে তাদের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, দহবন্দ, বেলকা, হরিপুর, কাপাসিয়া ও চন্ডিপুরসহ ৬টি ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদী এখন শীর্ণকায় নালার সাদৃশ্য শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার একর জুড়ে শুধু ধু-ধু বালুচর। যে নদীর বুকে নৌকায় চড়ে মানুষকে এপার থেকে ওপারে যাতায়াত করতে হতো- এখন সেই নদীতে মানুষদের পায়ে হেঁটে বিশাল চর অতিক্রম করে গন্তব্য স্থলে পৌঁছতে হয়। ওই এলাকার যে লোকগুলো নদীতে মাছ শিকার করে এক সময় জীবিকা নির্বাহ করতো এখন নদীর বুকে চর জেগে ওঠায় তারা বেকার হয়ে পড়েছে। এছাড়া যারা নৌকায় লোক পারাপার করতো তাদের নৌকা এখন নালার স্বল্প পানিতেই আটকা পড়ে গেছে। তারাও এখন বেকার।
এ অবস্থা শুধু তিস্তা নদীর নয়- ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতেও একই অবস্থা। পলি জমে নদী ভরাট হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওর ভেতরে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। নদীগুলো পানি শূন্য হয়ে পড়ায় পানিনির্ভর হাজার হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা সেচ সংকটের মুখে বিকল্প ব্যবস্থায় ব্যয়বহুল সেচ পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। আর এ কারণে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে একমাত্র ড্রেজিং করেই নদীগুলোতে নাব্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। উল্লেখ্য, রেলওয়ে ফেরি রুটে নাব্য সংকট দূর করতে কোনো কোনো এলাকায় ড্রেজিং শুরু করা হলেও এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে।