দেশে আলু উৎপাদন এক কোটি টন ছাড়িয়েছে। আলু উৎপাদনে এখন বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে বাংলাদেশ। কয়েক বছর ধরেই ৪ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আলুর আবাদ হচ্ছে। আলু আবাদে প্রায় আট লাখ টন বীজের প্রয়োজন। বীজের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই এখন দেশে উৎপাদন হচ্ছে। জাত উদ্ভাবন সহজ করতে আলুকে অনিয়ন্ত্রিত ফসল হিসেবে ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে প্রায় ৪ লাখ ৬৯ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এ পরিমাণ জমিতে আবাদ করতে বীজের প্রয়োজন প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার টন। আগে বীজের চাহিদার প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর ছিল। এখন চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা মেটানো হচ্ছে দেশে উৎপাদিত বীজের মাধ্যমে। বীজের চাহিদার জোগান দিচ্ছে দেশের কৃষক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারিভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষক পর্যায়ে বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজ করার কারণে দেশের কৃষকরাই এখন মূল উৎপাদক। আর টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করে কৃষকরাই তাদের চাহিদা মেটাতে পারছেন।
জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও মাটির কারণে বেশকিছু জেলায় আলুর প্রায় ৩০টি জাত ব্যাপকভাবে আবাদ করা হচ্ছে। গত বছর আলুর উৎপাদন আমাদের চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ টন বেশি হয়েছে। আলুকে আগামী তিন বছরের জন্য অনিয়ন্ত্রিত ফসল হিসেবে ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। জাতীয় বীজ বোর্ডের ১০০তম সভায় এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী তিন বছরে বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
অনিয়ন্ত্রিত ফসল ঘোষণার যুক্তি হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে প্রায় এক কোটি টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। সেখানে খাবার আলু হিসেবে ৬৫-৭০ লাখ টন ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া রফতানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জাতের অভাবে রফতানি বাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। প্রতি বছর মাত্র ৫০-৬০ হাজার টন আলু রফতানি হচ্ছে। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এছাড়া প্রচলিত জাত ছাড়করণ ও মূল্যায়নে দীর্ঘসময় প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় রফতানি উপযোগী, শিল্পে ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতের উপযোগী আলুর জাত নিবন্ধনের স্বার্থে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক বছরের জন্য আলুর জাতকে অনিয়ন্ত্রিত ফসল হিসেবে ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান বীজতত্ত্ববিদ মো. আজিম উদ্দিন বলেন, আলুবীজে আমরা মূলত আমদানিনির্ভর ছিলাম। এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই উৎপাদনের স্বয়ম্ভরতার দিকে যাচ্ছি। দেশে আলুবীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে টিস্যু কালচার বিরাট ভূমিকা রেখেছে। যেকোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বীজের জাত উদ্ভাবন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আলুকে অনিয়ন্ত্রিত ফসল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখন যে কেউ চাইলে জাত উদ্ভাবন করতে পারবেন। সেখানে মন্ত্রণালয় শুধু মান দেখবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দেয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অবহেলা রয়েছে পণ্যটি বিপণনে। একদিকে বিকল্প ব্যবহারের উদ্যোগের অভাব, অন্যদিকে আনা হচ্ছে না প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার উপযোগী কিংবা ঘাতসহিষ্ণু জাতও। আলুর বিদ্যমান জাতগুলোয় জলীয় অংশ বেশি থাকায় তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। হিমাগার সংকটের কারণেও পণ্যটির কাঙ্ক্ষিত মজুদ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। আলু উৎপাদনে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও মোকাবেলা করতে হচ্ছে কৃষককে। আলুর মড়ক বা নাবি ধসা (লেট ব্লাইট) রোগের কারণে প্রতি বছর ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এ পর্যন্ত যেসব জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, তার বেশির ভাগেরই নেই এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাই আলুর লেট ব্লাইট রোগ প্রতিরোধী জাতের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন উপযোগী আলুর জাতে নজর দিতে হবে। আলুকে কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা যায়, সে ব্যাপারে কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, দেশে যে কয়েকটি ফসল স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে আলু অন্যতম। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কৃষকের পরিশ্রমের কারণেই এ সফলতা এসেছে। তবে প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এবং আলুর বিকল্প ব্যবহার ও রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে পদক্ষেপ এখনো সীমিত। রফতানি বাজার বহুমুখীকরণে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে জোর দিতে হবে। আলুর নতুন জাত উদ্ভাবনে জলীয় পদার্থের পরিমাণ কম থাকা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রফতানি উপযোগী জাত উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিমাগারের ধারণক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কয়েক বছরে দেশে আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলেও তা সঠিকভাবে বিকশিত হয়নি। সূত্র: বণিক বার্তা
সানবিডি/ঢাকা/এসএস