বকেয়া পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্ব শেয়ারবাজারের স্ট্রাকচার (কাঠাম) ধংস করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মতিঝিলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ)-এর অফিস এবং ওয়েবসাইট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজারের পতনটা শুরু হয়েছে, যখন এনবিআর’র চেয়ারম্যান বললো- বিনিয়োগ করতে হলে সবাইকে টিআইএন নম্বর লাগবে। আমরা যখন তার ভুল ভাঙালাম, তার পর এটি সংশোধন হলো। তার দুই-তিনদিন না যেতেই গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির সমস্যা শুরু হলো। এটা শুধুমাত্র বিটিআরসি বা গ্রামীণফোনকে ক্ষতিগ্রস্থ করেনি, আমার মার্কেটের স্ট্রাকচারকে ধংস করে দিয়ে গেছে।
এ সময় বিটিআরসি-গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্ব কিভাবে মার্কেটের স্ট্রাকচার বা কাঠামো ধংস করেছে তাও ব্যাখ্যা করেন খায়রুল হোসেন। তিনি বলেন, বিদেশিরা যখন আসে ওরা ফান্ডামেন্টাল শেয়ার দেখে আসে। গ্রামীণফোনের পাশাপাশি ওরা অলেম্পিক কিনেছে, ওরা ইউনাইটেড পাওয়ার কিনেছে, ওরা স্কয়ার ফার্মা কিনেছে। তারা সব বিক্রি করে যাচ্ছে। ওরা গ্রামীণফোনের সঙ্গে স্কয়ার ফার্মা, ইউনাইটেড পাওয়ার, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাক বিক্রি করেছে ।
স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাক, ইউনাইটেড পাওয়ার এবং অলেম্পিক এই পঁচটি কোম্পানি শেয়ারবাজারের পতনের ৮০ শতাংশ কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, বাজার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- বিগত দুই মাসে সূচক ৩৬৪-৩৬৫ পয়েন্ট পড়েছে, এর মধ্যে ২৮০ পয়েন্টই পড়েছে স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণরেফান ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাক এই তিন কোম্পানির কারণে।
এ সময় তিনি বলেন, বিদেশিরা বিক্রি করে গেলে যে পেশার থাকে তা বাজার নিতে পারে না। আর বিদেশিরা কোন হাউজ থেকে বিক্রি করে? সূচকের ওপর বড় বড় প্রভাব আছে এমন শেয়ার বিক্রি করে। সেখানে (ব্রোকারেজ হাউজ) যত বিনিয়োগকারী আছে তারা ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। অর্থাৎ একটাকে দেখে আর একটা প্রভাবিত হয়। এটি একটি সাইকেলের মতো কাজ করে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, আর একটি রিউমার বাজারে আছে- টাকার ডিভ্যালুয়েশন হবে বাংলাদেশে। অর্থমন্ত্রী আজ পরিস্কার করে দিয়েছেন- টাকা ডিভ্যালুয়েশন হওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি এ বিষয়ে প্রশ্ন করে ছিলাম, উনি বলেছেন টাকার ডিভ্যালুয়েশন হবে না। কারণ ডিভ্যালুয়েশন করলে রফতানিকারকরা উপকৃত হবেন, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, টাকার ডিভ্যালুয়েশন হবে না, এই বিশ্বাস যদি আমাদের মধ্যে ফিরে আসে তাহলে বাজার ভালো হবে। কারণ বাংলাদেশের মার্কেটের মতো এতো রিটার্ণ কোথাও নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসতে চাই।
খায়রুল হোসেন বলেন, এখন একটা কথা প্রায় বলা হয়- মানি নাই তাই বাজার ধংস হয়ে যাবে। বিগত নয় মাস কোন আইপিও নাই তাহলে বাজার কেন পড়ে যাচ্ছে? পৃথিবীর কোন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই গ্যারান্টি দেবে না, সরা বছর একটি কোম্পানির শেয়ার দাম ফেস ভ্যালুর ওপরে থাকবে। একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যেখানে আইপিওতে আসা প্রত্যেকটি কোম্পানির শেয়ার দাম লেনদেনের শুরুতে ফেস ভ্যালুর ওপরে থেকেছে।
এ সময় শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়েও সমালোচনা করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আমরা বলি না আপনারা (ব্যাংক) এক্সপোজার লিমিটের ওপরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এক্সপোজার লিমিট যেটুকু আছে, সেটুকু করেন। মার্কেটের পাশে তো দঁড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইন করেছে- ব্যাংককে তিন বছরের মধ্যে আইপিওতে আসতে হবে। এখন ঘোষণা দেয়া হয়েছে ২৭টি বীমা কোম্পানিকে বাজারে আসতে হবে।
“ওরা আসলে আমাদের কি লাভ? ওরা এসে টাকা উঠিয়ে যদি এফডিআর করে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করে, তাহলে পুঁজিবাজারের স্বার্থে আমরা কেন এগুলো দেব। অথচ সরকারের কোম্পানি আমরা আনতে পারছি না। আমরা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আনতে পারছি না” বলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর কোথায় দুই শতাংশ (কোম্পানির প্রত্যেক পরিচালককে কমপক্ষে দুই শতাংশ শেয়ার ধারণ করা), ৩০ শতাংশ (কোম্পানির পরিচালকদের সম্মেলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা) আইন নেই। আমরা এটা কেন করলাম? আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর দেখলাম ৯০ শতাংশ মালিকরা চলে গেছেন। বিভিন্ন কলা-কৌশল করে শেয়ারের দাম ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তারা চলে গেছে। অন্তত্য তারা যেন শেয়ার বাইব্যাক করে, এ চিন্তা করে পৃথিবীর কোন দেশে না থাকার পরও একটি আনপোপুলার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়।
সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে খায়রুল হোসেন বলেন, সাংবাদিকরা একদিকে যেমন সমাজের দর্পণ, অন্যদিকে তাদের লেখুনি (লেখা) যে কোন তলোয়ারের থেকে শক্তিশালী। কাজেই তাদের যে কোন লেখুনি বস্তুনিষ্ট হবে। এতে সমাজ ও দেশ উপকৃত হবে।
সিএমজেএফ’র সভাপতি হাসান ইমান রুবেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিতি ছিলেন বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী, স্বপন কুমার বালা, কামারুজ্জামান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, ডিবিএ সভাপতি শাকিল রিজভী, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান প্রমুখ।