জ্বালানি খাতে উদ্বৃত্ত আছে ৭০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ভোক্তার জামানত বাবদ আছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই টাকা দিয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে বিইআরসির অধীনে একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
রোববার (২২ নভেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বিদ্যুতে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ে ক্যাবের প্রস্তাব’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মলনে এই প্রস্তাব দেয় ক্যাব।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব অযৌক্তিক। ক্যাবের পক্ষ থেকে বিইআরসির কাছে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেই প্রস্তাব বিবেচনায় নিলে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয়, কমানো যাবে।’
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের সময় মোট অযৌক্তিক ব্যয় ১০ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। এই ব্যয় সমন্বয়ে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম এবং সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জ পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্যাবের আপত্তি রয়েছে।’
শামসুল আলম বলেন, যৌক্তিক ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না বলেই মূল্যহার নির্ধারণে ভোক্তা সুবিচার পায় না। ভোক্তা সঠিক দাম এবং মানের বিদ্যুৎ পায় না। ভোক্তা অধিকার বিপন্ন।’
ক্যাব জানায়, বিদ্যুৎ, কয়লা, গ্যাস ও তরল জ্বালানি খাতে উদ্বৃত্ত কম-বেশি ৭০ হাজার কোটি টাকা মজুত আছে। এছাড়া, ভোক্তার জামানতের পরিমাণও সবখাত মিলিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব টাকা দিয়ে বিইআরসি’র অধীনে একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে।’
ক্যাবের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান ও গবেষণা কমিশনের সভাপতি এবং কলামিস্ট আবুল মকসুদ বলেন, ‘বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় আমরা ভোক্তাদের পক্ষ থেকে উদ্বিগ্ন। এখন বিইআরসির কাছে দাম বেড়ানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা অযৌক্তিক।
শহরে যেভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, গ্রামে সেভাবে পাওয়া যায় না। অথচ দাম একই। এই বৈষম্যমূলক নীতির আমরা বিরোধী। বার বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো বেদনাদায়ক। সরকারের উদ্দেশে বলছি, আপনারা বৈদ্যুতিক শক দেবেন না। ন্যায্যমূল্যে বিদ্যুৎ দেন।’
ক্যাবের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান ও গবেষণা কমিশনের সদস্য বদরুল ইমাম বলেন, ‘অপরিকল্পিত ব্যয়বহুল আমদানি করা জ্বালানির কারণে বাড়ছে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ। বাংলাদেশের উচিত সাশ্রয়ী জ্বালানির যোগান দেওয়া, যেন বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে।’
তিনি বলেন, ‘সাগর, পার্বত্য এলাকাসহ দেশের অনেক এলাকায় এখনও কোনও অনুসন্ধান কাজ হয়নি। কোনও পরিকল্পনায় করা হচ্ছে না। উৎপাদন খরচ কমাতে কোনও উদ্যোগ নাই। ফলে বিদ্যুতের দাম কমাতে হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী জ্বালানির যোগান দেওয়া জরুরি।’
ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘সরকার বিদ্যুৎখাতে অনেক কাজ করছে। কিন্তু কিছু কিছু কাজে সমালোচনা হচ্ছে। এরমধ্যে একটি হলো— বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি। অযৌক্তিকভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ঠিক হবে না। আমরা চাই, বিইআরসি সবার মতামতের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিক।’
তিনি বলেন, ‘ক্যাবের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমাতে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কমিশনের উচিত বিবেচনায় নেওয়া।’
ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে সামনে আসছে দুইটি বিষয়। একদিকে, সাগরের বিশাল জায়গা পড়ে আছে, অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, আমদানি করে এলএনজি, কয়লা আর তেল আনা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। এই অজুহাতেই বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম।’
তিনি বলেন, ‘কমিশনের একজন সদস্য জামিনের মুক্ত অবস্থায় আছেন। তাকে দিয়ে কী করে বিদ্যুতের দামের শুনানি হয় সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি শুধু বিদ্যুতের দাম না— সব জিনিসের দাম বৃদ্ধি। যার সরাসরি ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ।’ মোবাশ্বের হোসেন সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলবেন না। এই মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক হবে না।’
সানবিডি/ঢাকা/এসএস