রেলওয়ে স্টেশনে প্রায়ই ব্যাগ ও সেলফোন চুরি যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। মাদক কেনা-বেচা, সেবন, পরিবহনসহ অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবেও দেশের রেলওয়ে স্টেশনগুলোর পরিচিতি বেশ পুরনো। সন্ত্রাস দমনের মতো নিরাপত্তা কার্যক্রম এখনো কোনো স্টেশনে গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় স্টেশনে ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি সিস্টেম (আইএসএস) চালুর কথা ভাবছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
আইএসএস বিশ্বজুড়ে রেলওয়ে স্টেশনের নিরাপত্তায় বেশ জনপ্রিয় পদ্ধতি। পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এবার বাংলাদেশেও ঢাকার কমলাপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনকে আইএসএসের আওতায় আনছে রেলওয়ে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে করা যায়, তা পর্যালোচনা করে দেখছে সংস্থাটি।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইএসএস ব্যবস্থায় স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। স্টেশনে কোনো যাত্রী প্রবেশ করতে চাইলে বডি স্ক্যানার, ব্যাগ স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা কর্মীরা হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়েও যাত্রীর শরীর ও ব্যাগ তল্লাশি করবেন। গাড়ির জন্য স্থাপন করা হবে আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং সিস্টেম (ইউভিএসএস)। স্টেশনে যাত্রীদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা। থাকবে বোমা শনাক্তকরণ ও নিষ্ক্রিয়করণ ব্যবস্থাও। স্টেশনগুলোয় যাত্রীদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পাশাপাশি স্টেশনে কতসংখ্যক মানুষ উপস্থিত আছে, তা গণনার যন্ত্রও স্থাপন করা হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কন্ট্রোল ও কমান্ড সেন্টারও থাকবে।
রেলওয়ে স্টেশনে আইএসএস স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে নেট কানেক্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রস্তাবের আলোকে সম্প্রতি রেল ভবনে কমলাপুর স্টেশনের জন্য আইএসএস স্থাপন ও চালুর জন্য রেল ভবনে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আইএসএসের ওপর একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন নেট কানেক্ট লিমিটেডের প্রতিনিধিরা।
তাদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, স্টেশনে প্রবেশের সময় যাত্রীদের হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হবে। স্টেশনের প্রবেশ ও বহির্গমনপথে স্থাপন করা হবে আর্চওয়ে ও ব্যাগেজ স্ক্যানার। সর্বোচ্চ নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হবে থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি। নজরদারির জন্য থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও। নেট কানেক্ট লিমিটেডের প্রতিনিধিরা জানান, প্রস্তাবিত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রেলওয়ে স্টেশনের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা যাবে এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, বর্তমানে জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে সন্ত্রাস দমনের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। এজন্য আইএসএস একটি ভালো উদ্যোগ। নেট কানেক্ট লিমিটেড আইএসএস স্থাপনের যে প্রস্তাব দিয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সেটি পর্যালোচনা করবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান আইএসএস স্থাপনের বিষয়টিকে অত্যন্ত যুগোপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন ।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট—এ পাঁচটি বিভাগীয় রেলওয়ে স্টেশনে আইএসএস স্থাপনের কাজ রাজস্ব বাজেট থেকে ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) মাধ্যমে শুরু করা যায় কিনা, বাংলাদেশ রেলওয়ে তা পর্যবেক্ষণ করে একটি ইন্সপেকশন রিপোর্ট প্রস্তুত করবে এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তা অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করবে।
এদিকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্যোগে (পূর্ব) কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ‘অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেম’ স্থাপনের কাজ চলছে। আবার আইএসএসের মধ্যেও রয়েছে অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেম। এ অবস্থায় আইএসএস স্থাপনে রেলওয়েকে দ্রুত করণীয় ঠিক করতে বলেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন। পাশাপাশি অ্যাকসেস কন্ট্রোল সিস্টেমের সঙ্গে আইএসএসের সামঞ্জস্য বিধানের কথাও বলেছেন তিনি।