
মাগুরা সদর উপজেলার লক্ষ্মীকন্দর গ্রামটি স্থানীয়ভাবে শিম গ্রাম হিসেবে পরিচিত। চলতি মৌসুমে এই গ্রামে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত শিম সারাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যসত্ত্বভোগী ও ব্যাপারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বরাবরই এখানকার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শিমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।
জেলা কৃষি বিভাগ ও বাজার বিপণন কর্মকর্তারা বলছেন, শিম চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তবে তারা জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে কৃষকের উৎপাদিত সবজির ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
মাগুরা সদরের লক্ষ্মীকন্দর গ্রামের রাস্তার দুই পাশে যেদিকে চোখ যায় শুধু শিম আর শিম ক্ষেত। বছরের পর বছর ধরে পারনান্দুয়ালী, ঠাকুরবাড়ী, লক্ষ্মীকন্দর, কছুন্দি, রামনগর, বেলনগর, পতুরিয়া, দুর্গাপুরসহ আশপাশের ১০ গ্রামের কমপক্ষে এক হাজার কৃষক এ মাঠে শুধু শিম চাষ করে আসছেন। এখানকার উৎপাদিত স্থানীয় জাতের মোটা ও চওড়া শিম সারাদেশে ব্যাপক সমাদৃত। যে কারণে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে চালান হওয়ার পাশাপাশি এখানে উৎপাদিত শিম বিদেশেও রপ্তানি হয়ে থাকে। শিম চাষে উপার্জিত টাকা দিয়েই এলাকার কৃষকরা সারাবছর জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
তবে আড়ৎদার, ব্যাপারী ও মধ্যসত্ত্বভোগী সিন্ডিকেটের কারণে বরাবরই এখানকার চাষিরা তাদের উৎপাদিত শিমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বর্তমানে যেখানে স্থানীয় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, সেখানে এখানকার কৃষকরা পাইকারি বাজারের নিয়োগকৃত আড়ৎদার ও ব্যাপারী সিন্ডিকেটের কাছে ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কৃষকদের অনেক কষ্টে উৎপাদিত পণ্যের লাভের অধিকাংশই চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
লক্ষণ মণ্ডল, নীলকান্ত মণ্ডল, বাদল চন্দ্র বিশ্বাসসহ একাধিক কৃষক অভিযোগ করেন, মাগুরা পাইকারি কাঁচাবাজারের নিয়োগকৃত দুই-তিনজন ব্যাপারী তাদের এলাকার সব শিম কিনে নেন। অন্য ব্যাপারীদের এলাকায় ঢুকতে না দেওয়ায় তাদের বেঁধে দেওয়া ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দামে কৃষকরা শিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে বর্তমানে স্থানীয় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিমের দাম ৩০ টাকা। এছাড়া তাদের উৎপাদিত শিম ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। কিন্তু লাভের সব অংশই চলে যাচ্ছে মধ্যসত্ত্বভোগীদের পকেটে।
কৃষকদের অভিযোগ, এক বিঘা জমিতে শিম চাষ করতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। অন্যদিকে প্রতি কেজি শিম ক্ষেত থেকে তুলতে খরচ হয় দুই টাকা, এর পর রয়েছে পরিবহন ও আড়ৎদারী খরচ। প্রতি কেজি শিম বিক্রি করে বর্তমানে কৃষকের পকেটে যাচ্ছে মাত্র পাঁচ টাকা। অন্যদিকে মধ্যসত্ত্বভোগীর পকেটে যাচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। লক্ষ্মীকন্দর এলাকার কৃষকরা স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে তাদের উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য দাবি করেছেন।
সুকেশ বিশ্বাস ও রজব আলী নামে দুইজন ব্যাপারী বলেন, মাগুরা লক্ষ্মীকন্দর গ্রামের শিম অত্যন্ত মানসম্পন্ন। তাছাড়া গাছ থেকে তুলে প্রক্রিয়াজাত করার পর এ শিম দীর্ঘদিন ভাল থাকায় বিদেশে রপ্তানিযোগ্য। যে কারণে ঢাকার আড়ৎদাররা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এ শিম রপ্তানি করে থাকেন।
তবে কৃষকের নায্যমূল্য প্রাপ্তির ব্যাপারে তারা বলেন, কাঁচাপণ্যের ব্যবসায় অনেক ঝুঁকিও রয়েছে, যে কারণে কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে দামের তারতম্য রয়েছে।
স্থানীয় ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিকুঞ্জ কুমার মণ্ডল বলেন, লক্ষ্মীকন্দর মাঠের শিম আকারে বড় ও মোটা, খেতেও অত্যন্ত সুস্বাদু। এজন্য সারাদেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উৎপাদিত শিমের বাছাইকৃত একটি বড় অংশ ঢাকা থেকে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু তালহা বলছেন, লক্ষ্মীকন্দর গ্রামের প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। এখানকার শিম সারাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তারা এলাকায় নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
জেলা মাকের্টিং অফিসার বলছেন, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শিমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে শিমের দাম অনেক বেশি। তারা জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে কৃষকরা যাতে সরাসরি বিদেশে শিম রপ্তানি করতে পারেন সে বিষয়েও তারা কাজ শুরু করেছেন। সূত্র: বাংলানিউজ
সানবিডি/ঢাকা/এসএস