ট্রান্স ফ্যাট হচ্ছে এমন এক ধরণের অসম্পৃক্ত চর্বি বা ফ্যাট, যা আমরা প্রতিদিন খাবারের সাথে খাই। ভেজিটেবল অয়েল বা উদ্ভিজ তেলের (পাম, সােয়াবিন ইত্যাদি) সাথে হাইড্রোজেন যুক্ত করলে তেল জমে যায় এবং এই তেলে ট্রান্স ফ্যাট উৎপন্ন হয়। এই অসম্পৃক্ত চর্বি বা ট্রান্স ফ্যাট আমাদের শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং উপকারী কোলেস্টরল কমায়। এটি রক্তচাপ বাড়ায়, ইনসুলিন নিগমন কমিয়ে দেয়। ফলে স্ট্রোক হয় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ মানুষ হৃদরােগে মারা যায়, যা খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন।
বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারী) কনজুমারস এসােসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং প্রস্তু-প্রগতির জন্য জ্ঞান এর যৌথ উদ্যোগে আয়ােজিত 'খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট, হৃদরােগ কি এবং করণীয় ও ভোক্তা পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক আলােচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, খাদ্য শিল্পে ব্যবহৃত বনস্পতি, মার্জারিন, ভালভা ইত্যাদি ট্রান্স ফ্যাটের অন্যতম উৎস। গবেষকদের মতে, ডালডা ও বনস্পতিতে প্রায় ২৫-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাট থাকে। ডুবাে তেলে মচমচা ভাজা খাবারে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ট্রান্স ফ্যাট । এছাড়া, বেকারি ও প্যাকেটজাত খাবারেও অতিমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাট থাকে। ভোজ্যতেল বারবার ব্যবহার করলেও তাতে ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর । আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বিশেষ করে শিশুরা ফাস্টফুডে আসক্ত। ভাজা-পােড়া খাবার তাদের বেশি পছন্দ। বেকারি বিস্কুট, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রীম, বার্গার, পিৎজা, চানাচুর এবং হােটেল-রেস্তোরায় তৈরি খাবার যেমন: সিঙ্গারা, সমুচা, মােগলাই পরটা, ডালপুরি, বেলপুরি, ফুচকা, চিকেনফ্রাই ইত্যাদি খাবারও বর্তমান জেনারেশনের বেশি পছন্দ। এগুলাে তৈরিতে ডালড়া ও বনস্পতি ব্যবহৃহ হয়, যাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ট্রান্স ফ্যাট। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরণের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ সময় অতিথিদের সামনে ভোক্তা দাবিনামা গুলো তুলে ধরা হয়। দাবি গুলো হচ্ছে:

মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পোৎপাদিত খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ পরিমাণ মােট ফ্যাটের ২ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত রাখা এবং খাদ্য উপকরণ হিসেবে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা PHO এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছে। এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের খাদ্য উৎপাদন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। খাদ্য শিল্প কারখানায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপকরণের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জনগণকে ট্রান্স ফ্যাটের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সজাগ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা, বিশ্ব বরেণ্য নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে শিল্পসমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপকল্প ঘােষণা করেছেন। এ রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেধাবী ও সুস্থ-সবল জনগােষ্ঠি প্রয়ােজন। খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ কমিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এছাড়া, আমরা ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করছি। এসডিজির ৩নং লক্ষ্য হচ্ছে, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ (Good Health and Well-being) নিশ্চিত করা। এর আলােকে আমাদের সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রােগজনিত মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটি অর্জনের জন্যও সুস্থ ও নিরােগ জনশক্তি দরকার ।
মন্ত্রী আরো বলেন, খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের উপস্থিতি এবং হৃদরােগের ঝুঁকি কমাতে আজকের আলােচনা সভায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ওঠে এসেছে। এর জন্য কার কী করণীয়, সে বিষয়ে মুল্যবান মতামত পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি মােকাবেলা সরকারের একার পক্ষে এগুলাে পুরােপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। খাদ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, পরিবেশক, ভােক্তা সাধারণ, চিকিৎসক, আইনজীবী, গণমাধ্যম, ভােক্তা অধিকার সংগঠন, সশীল। সমাজ, জনপ্রতিনিধিসহ সবাইকে এ লক্ষ্যে এক হয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই পণ্যের ক্রেতা-ভােক্তা। যারা শিল্প-কারখানায় খাদ্য পণ্য উৎপাদন করছেন তারা নিজেরাও এসব পণ্য ভােগ করছেন। তাদের আত্মীয়-স্বজন এগুলাে ভােগ করছেন। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনা করে সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে। মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করতে হবে।।
শিরােহপাদিত টান্স ফ্যাটের ক্ষতিকর প্রভাব হতে সুরক্ষার জন্য দেশে এখন পর্যন্ত কোনাে আইন বা নীতিমালা হয়নি বলে কেউ কেউ উল্লেখ করছেন কে। বলেছেন খাদ্যে সর্বোচ্চ কী পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট থাকবে- তা এখনও নির্ধারিত হয়নি কিবা খাদ্যপণ্যের লেবেলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ করা ঐচ্ছিক হিসেবে রাখা। গেছে। টান্স ফ্যাটের মত ঝুকিপূর্ণ আইটেমের ঘােষণা কোনােভাবেই ঐচ্ছিক হতে পারে না বলে আমিও আপনাদের সাথে একমত। একে বাধ্যতামূলক ঘোষণার আয়। cont হবে। এ বিষয়ে কত প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমি বিএসটিআইকে নির্দেশনা দিচ্ছি। আপনারা দেখেছেন, বিএসটিআই সম্প্রতি গণমাধ্যমে স ব্যাট ক আর | ‘সনকরণ বিলি' পােশ করেছে। টাল ফ্যাটের ক্ষতিকর প্রভাব মােকাবেলায় শিল্প প্রণালয়ের নিদেশনায় বিএসটিআই কাজ করে।
ট্রান্স ফ্যাট প্যারামিটারটি সংশ্লিষ্ট পণ্যের জাতীয়মানে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সঙ্কল খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বিষয়স। নবিত মাত্রার মধ্যে রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে ভালভা বা বনস্পতির আমদানি, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকারের পাশাপানি তেলী প্রতিষ্ঠানগুলােকেও এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। খাদ্যপণ্য তৈরিতে হাইড্রোজেনেছে তেলের ব্যবহার কমাতে সহায়ক প্রযুক্তির প্রয়োগ ৰতে হবে।
হোটেল-রেস্তোরায় একই তেল দীর্ঘ সময় ধরে ভাজা পােড়ার কাজে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এ জন্য বিএসটিআই এর বিশেষ অভিযান ও সাজে। মে তোরনার করা হবে। পাশাপাশি ভােজা সাধারণকেও এ বিষয়ে সচেতন করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদাত্ত আহবান জানাই। পরিশেষে ল আই নিয়ে আলোচনার আয়োজন করায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানায় আমার বক্তব্য শেষ করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সভাপতি গােলাম রহমান। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিক বিএসটিই-এর মহাপরিচালক মােঃ মুয়াজ্জেম হোসাইন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তপকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুব কবীর। গ্লোবাল হেলথ এডভোকেসি ইনকিউবিটর এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর জনাব মুহাম্মদ রুহুল কুদূল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়গণ।
সানবিডি/ঢাকা/এসআই