হাওরের রাজ্যে হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত রয়েছে সুনামগঞ্জের। এই অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বছরে দুবার ধানের আবাদ করা দুঃসাধ্য এই । ফলে রীতিমতো কর্মহীনতায় পড়ে যান কৃষকরা, শুরু হয় অভাব অনটন। তবে ইদানীং বিকল্প চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন তারা। ধানের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা,সরিষা ও সূর্যমুখীর আবাদ করছেন কৃষকরা।
জানা যায়- শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি, কৃষি উপকরণের চড়া দাম, ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওর এলাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বোরো আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন কৃষকরা। অপ্রচলিত শস্য (ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী) আবাদ করতে খরচ কম কিন্তু উৎপাদন বেশি ও লাভজনক। ফলে এসব ফসলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন হাওর এলাকার কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, এক কেয়ার (৩০ শতক) জমিতে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয় কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা। ধান পাওয়া যায় ১০ থেকে ১২ মণ। অন্যদিকে একই পরিমাণ জমিতে ভুট্টা চাষ করলে খরচ হয় দুই হাজার টাকা। ভুট্টা উৎপাদন করা যায় ৩০ মণ, যার বাজার দর ২৪ হাজার টাকা। এই হিসেবেই তারা ধানের পরিবর্তে জমিতে এসব ফসলের উৎপাদন করছেন।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের আমরাগড় গ্রামের কৃষক খসরু মিয়া বলেন, ‘আগে জমিতে ধান চাষ করতাম। এখন ভুট্টা করি। স্বল্প সময়ে বেশি ফলন ও অধিক লাভ হওয়ায় জমিতে সরিষা ও ভুট্টার আবাদ করছি।’
চিনাকান্দি গ্রামের মুকিম মিয়া বলেন, ‘একমণ ধানের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। অন্যদিকে একমণ ভুট্টার দাম ৮০০ টাকা। তাই ভুট্টা চাষ করেছি।’
এদিকে এসব শস্য উৎপাদনে সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার ফলে প্রতিবছর এসব শস্যের উৎপাদনও বেড়ে চলছে।
স্থানীয়রা জানান, হাওরবাসীরা বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে বোরো ধানের উৎপাদন। কখনও আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টিসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরের বোরো ফসল। চারা লাগানো থেকে শুরু করে বোরো ধান কেটে ঘরে তুলতে সময় কম লাগে। ধানের চেয়ে শস্যের উৎপাদন খরচ কম থাকায় শস্য উৎপাদনে অধিক মুনাফা অর্জন করেন কৃষক। তাই হাওরের ধানের জমিতে এখন উচ্চ ফলনশীল জাতের ভুট্টা, সরিষা ও সূর্যমুখীর আবাদ করছেন তারা। সুপারসাইন, মিরাক্কেল, এভারেস্ট, কোহিনূর, বারী জাতের ভুট্টা, হাইসাইন জাতের সূর্যমুখী ও বীণা ৯ ও বারি ১০, ১৪, ১৫, ১৬ জাতের সরিষার আবাদ করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানায়- চলতি অর্থবছরে ভুট্টা ৪২৭ হেক্টর, সরিষা ২ হাজার ১১৫ হেক্টর, সূর্যমুখী ২৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। গতবার ১ হাজার ৬৫৬ হেক্টরে সরিষা, ২৭৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদ করেছিলেন কৃষক। অপ্রচলিত ফসলের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৬ হাজার ৭০০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখীর বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে।