চীনে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে করোনাভাইরাস।এ্রই ভাইরাসের প্রভাব তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চামড়া শিল্পেও পড়েছে। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে সাভারের হরিণধরা এলাকায় ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে চীনই এ খাতের অন্যতম বাজার। দেশের মোট ৬০ শতাংশ চামড়া রফতানি করা হয় চীনা বাজারে। তবে ভাইরাসের কারণে রফতানি বন্ধ থাকায় ট্যানরি মালিকদের মনে তৈরি হচ্ছে আশঙ্কা। ব্যাংক লোন, শ্রমিকদের বেতনসহ বিভিন্ন রকম খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি সাভার উপজেলার হরিণধরায় অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্প নগরীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাইরাসের কারণে ব্যবসায়ীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এর ভবিষ্যত নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বেশির ভাগ ট্যানারি তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। চীনা বাজারে চামড়া সরবরাহ করতে না পারায় রফতানি জন্য প্রস্তুতকৃত চামড়ার স্তূপ জমেছে ট্যানারিগুলোতে।
বাংলাদেশ ট্যানারি এ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এর সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির মালিক সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১৭ সালে ৮ এপ্রিল সাভারে ট্যানারিগুলো যখন একদিনের মধ্যে স্থান্তরিত করা হয় তখন ২২২টি ট্যানারির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে ইউরোপ ও কোরিয়ার বায়াররা অন্য দেশ থেকে চামড়া কেনা শুরু করে। আর সে সময় চামড়া শিল্প নগরীতে সেন্ট্রাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি (সিইটিপি) পরিপূর্ণ ভাবে চালু করতে না পারায় ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নেয়। তখন চীনের বাজারই হয়ে উঠে এ খাতের অন্যতম বাজার। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্ডার পাওয়া প্রস্তুতকৃত চামড়ার স্তূপ জমেছে ট্যানারিগুলোতে। আর নতুন করে চীনের বায়ার না আসায় রফতানিও থেমে গেছে।
জানুয়ারির ১৫ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরী থেকে আমরা কোন চামড়া চায়নাতে রফতানি করতে পারিনি। আমাদের কোন এলসি, টিটি, আমরা এখনও পাইনি। বিভিন্ন ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১০০ কন্টেনার চামড়া প্যাকিং অবস্থায় আছে। যার বাজার মূল্য ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার এবং আরও অনেক চামড়া যা প্রোডাকশনের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে।
ট্যানারির মালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে চীনা বায়াররা না আসায় বাজারে টিকে থাকা নিয়েই হতাশ তারা। তবে চামড়ার এ খাত টিকিয়ে রাখতে নীতি-নির্ধারকদের প্রতি নতুন বাজার সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন তারা। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ চামড়ার চাহিদার শতভাগ যদি পূরণ করা যায় তাহলে এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। প্রগতি লেদার কমপ্লেক্স লিঃ-এর মালিক সামসুল হুদা স্বপন জানান, গত তিন বছরে ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১৩০টি ট্যানারি তাদের প্রোডাকশন শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে চীনই আমাদের এ খাতের সবচেয়ে বড় বাজার। ভাইরাসের কারণে চামড়া রফতানি বন্ধ রয়েছে। আর রফতানি বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বেতনসহ বিভিন্ন রকম খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।
আনোয়ার ট্যানারির লিমিটেডের চীফ লেদার টেকনোলজিস্ট সৈয়দ রুবেল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় চীনে। করোনাভাইরাস সঙ্কট যতই দীর্ঘায়িত হবে ততই বাংলাদেশের চামড়া শিল্প অধিকতর কঠিন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
আল-মদিনা ট্যানারির মালিক মোঃ রুবেল বলেন, এই মুহূর্তে এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে না পারলে আমদের বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। করোনাভাইরাসের প্রভাবের আগে যে অর্ডারগুলো নেয়া হয়েছিল। সেগুলো কোয়ালিটি চেক (কিউসি) না হয়ায় প্লাস্টিকের মোড়ক দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে অর্ডার না পাওয়াতে ট্যানারি বন্ধ করে রেখেছি।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের পর থেকেই লোকসানে রয়েছে দেশের চামড়া শিল্প। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৩ কোটি ৪ লাখ ডলারের চামড়ার রফতানি বাজার হ্রাস পেয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলারে। আর গত অর্থবছরে এর রফতানি বাজার ছিল ১০২ কোটি ডলার। এ আয় কমে যাওয়ার পেছনে চামড়ার আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোট লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এল ডব্লিউ জি) এর ছাড়পত্র না থাকা ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না করাকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্টরা।
লেদার গুডস এ্যান্ড ফুট ওয়্যার ম্যানুফ্যাচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী রওশনারা। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের এ্যাসোসিয়েশন ও মন্ত্রণালয় থেকে সকল ট্যানারি মালিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, যে তাদের রফতানি খাতে কতটুকু প্রভাব ফেলছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের চামড়া শিল্প নগরীতে সেন্ট্রাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি (সিইটিপি) তে চীনা নাগরিকরা কাজ করতেন। যারা চাইনিজ হলিডেতে চীনে গিয়েছিল তাদের মধ্য থেকে অনেকে এখনও ফিরে আসেনি।
তবে এখাতের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা থাকলেও নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে ফের বাজারে ফিরবে দেশের অন্যতম রফতানি আয়ের খাত চামড়া শিল্প এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের। সূত্র-জনকন্ঠ
সানবিডি/এনজে