কোনো রকম প্রশ্ন করার বিধান না রেখে ফ্ল্যাট ও জমি ক্রয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে সরকার। ফলে এখন থেকে ফ্ল্যাট ও জমি কিনলে তার আয়তনের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো প্রশ্ন করবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুবিধা দেওয়ায় আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি অবশেষে পূরণ হলো।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) নেতারা বলছেন, প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকায় আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ হবে। তাতে কারোনাভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত খাতটি আবার কিছুটা হলেও চাঙা হবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী ২০২০–২১ অর্থবছরের জন্য বাজেটে ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছেন। বাজেট প্রস্তাবে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ২০ হাজার টাকা; ধানমন্ডি, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী ও সেগুনবাগিচা এবং চট্টগ্রামে খুলশী, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদে জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ১৫ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হবে। তার বাইরে যেকোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজার টাকা কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করা যাবে।
ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রে আয়তনের ওপর নির্দিষ্ট কর দিলেই ক্রেতাকে এনবিআর ও দুদক কোনো প্রশ্ন করবে না।
অন্যদিকে ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করতে চাইলে ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে ৪ থেকে ৬ হাজার; ধানমন্ডি, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হাউজিং সোসাইটি (ডিওএইচএস), মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, নিকুঞ্জ, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা ও চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদে প্রতি বর্গমিটারে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হবে। এসব এলাকার বাইরে যেকোনো সিটি করপোরেশনে প্রতি বর্গমিটারে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করা যাবে।
জানতে চাইলে রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন গতকাল সোমবার বলেন, ‘অতীতে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ ছিল। তবে বিশেষ একটি সংস্থার প্রশ্ন করার সুযোগ থাকায় বিনিয়োগ সে অর্থে হয়নি। তবে অর্থমন্ত্রী এবার যে সুযোগ দিয়েছেন, তাতে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ আসবে। কারণ ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিনা প্রশ্নে সুযোগটি দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রচুর বিনিয়োগ আসায় আবাসন খাত চাঙা হয়েছিল। আশা করছি, এবার আবার সে রকম কিছু হবে।’
সংগঠনটির সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া গতকাল এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। প্রায় এক যুগ পর সুযোগটি দেওয়ায় আমরা মনে করছি, তা আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে।’
কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগের বাইরে আবাসন খাতে তেমন বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হয়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। চলতি ২০১৯–২০ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী ফ্ল্যাট ও প্লটের নিবন্ধন ব্যয় কমানোর কথা বললেও সেটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার কর ও স্ট্যাম্প ফি বাবদ ২ শতাংশ কমেছে। সব মিলিয়ে নিবন্ধন ফি শিগগিরই ১০ শতাংশে নামবে বলে আশা করছেন রিহ্যাবের নেতারা।
এদিকে করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অন্য অনেক শিল্পের মতো আবাসন খাতও স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রায় সব ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল দীর্ঘ দুই মাস। নতুন ফ্ল্যাটের বুকিং নেই। অনেক ক্রেতা বুকিং দেওয়া ফ্ল্যাটের কিস্তি দিচ্ছেন না। তাতে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে এখনো আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ঋণ নিতে পারেনি বলে জানান এই খাতের ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন উদ্যোগে যে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়াবে, সেটি বলা মুশকিল। তিনি বলেন, সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করার উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। সেই তহবিল থেকে যাঁরা জীবনের প্রথম ফ্ল্যাট কিনবেন তাঁদের ২ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া যেতে পারে। তাহলেই দ্রুততম সময়ে আবাসন খাত চাঙা হবে বলে মনে করেন তিনি। সূত্র: প্রথম আলো
সানবিডি/ঢাকা/এসএস