ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশে করোনার প্রভাব শুরু হয় কিছুটা বিলম্বে। ফলে এখানে লকডাউন শুরু হয় মার্চের শেষে ও এপ্রিলের শুরুতে। কিন্তু হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী এলাকায় অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় রিসোর্ট দি প্যালেসের লোকসান শুরু হয় মার্চ মাসের প্রথম থেকেই। কারণ এখানে যে বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বুকিং দেয় তারা ইউরোপের সাথে তাল মিলিয়েই তা বাতিল করে। ফলে ওই রিসোর্টের ব্যবসার ভর মৌসুম মার্চ মাসের সকল বুকিং বাতিল হয়ে যায়। এর পর থেকে বন্ধ থাকায় গত ৪ মাসে কোটি কোটি টাকা লোকসান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন কোনো কার্যক্রম না থাকলেও এটির ব্যবস্থাপনা ও বিশাল লোকবলের পেছনে খরচ করতে হচ্ছে মাসে ২ কোটি টাকা। সরকারও রাজস্ব হারিয়েছে উল্লেখযোগ্যপরিমাণ।
দি প্যালেস এর ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুরো মার্চ মাস এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই রিসোর্টে বিভিন্ন করপোরেট ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট বুকিং ছিল। এর মাঝে উল্লেখযাগ্য হলো নেসলে, ইউনিলিভার, কৃষি ব্যাংক ও সার্ভেয়ার বাংলাদেশ। এ সকল করপোরেট বুকিং থেকে দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় হয়। কিন্তু করোনার কারণে সকল বুকিং বাতিল হয়ে যায়। পাশাপাশি জার্মান কম্পানি সিমেন্স ও মারুবিনির পক্ষ থেকে প্যালেসের ১১টি রুম ৬ মাস থেকে এক বছরের বুকিং ছিল। করোনার জন্য সেই বুকিংগুলোও বাতিল হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত কোনো বুকিং না থাকলেও সেটি মেইনটেইন করতে এবং এর কর্মীদেরকে বেতন দিতে মাসে চলে যাচ্ছে ২ কোটি টাকা।
দি প্যালেস এর কো-অর্ডিনেটর কাজল আহমেদ জানান, এখানে ৩৮৫ থেকে ৩৮৯ জন কর্মী কাজ করেন। করোনায় সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কর্মীদের বেতন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল, জেনারেটর ব্যবহার, গাছের পরিচর্যা, রুম মেইনটেইনেন্স বাবদ বিপুলপরিমাণ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু কোনো আয় হচ্ছে না। প্যালেসকে কেন্দ্র করে এর বাইরেও আরো অনেক লোকজনের কর্মসংস্থান ছিল। তারাও কার্যত বেকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দি প্যালেসের কর্মীদের মাঝে ১২০ থেকে ১৩০ জন সেখানে কর্মরত আছেন। অন্য কর্মীরা বাড়িতে চলে গেছেন। এই সময়ে অনেক কর্মী ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেতন পেয়েছেন। প্যালেস থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি টাকা ভ্যাট পেয়ে থাকে। ৪ মাস যাবৎ সেটি বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব আদায়ও অনেক কমে যাবে।
দি প্যালেস সবুজেঘেরা পাহাড়, গিরিখাদ, সরোবর, ঝরনা আর ৩০ হাজার গাছে ঢাকা ১৫০ একর ভূমির ওপর নান্দনিক একটি রিসোর্ট। এটি গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক পরিবেশে এবং প্রকৃতিকে বুকে ধারণ করে। আবাসনের জন্য এখানে রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ তারকা সুবিধাসমেত, পাখিডাকা, ছায়াঢাকা ২৩টা ভিলা। প্রধান টাওয়ার ভবনে রয়েছে ১০৭টি বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম। সাথে রেস্টুরেন্ট ও হল রুম। প্যালেস রয়েছে চারটা বড় সভাকক্ষ, ৪০০ জনের ব্যাংকুয়েট হল, স্পা, ছোটদের খেলার জায়গা তিনটা, বিলিয়ার্ড, ফুটবল, বাস্কেটবল, ২টি টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, ক্রিকেট নেট প্র্যাকটিস এর সুবিধা, দুটি জিম, রিমোট কন্ট্রোল কার রেসিংয়ের ব্যবস্থা। দুটো সুইমিংপুল (১টি পুরুষ আর একটি মহিলা), ইনফিনিটি পুল, দুটো সিনেপ্লেক্স এর মধ্যে ১টি থ্রিডি ও অন্যটি টুডি। ৩টি হেলিপ্যাড ও দুটি ঝুলন্ত সেতু এবং একটি নান্দনিক মসজিদও আছে সেখানে। অ্যারাবিয়ান খাবার সিসা ইতালিয়ান, মেক্সিকান, ইন্ডিয়ান, কন্টিনেন্টাল, ভিয়েতনামি খাবার এবং আন্তর্জাতিক বুফেতে মিলে সবধরনের খাবার।
পর্যটনশিল্পে ধস
হবিগঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু পর্যটনকেন্দ্র এবং রিসোর্ট। কিন্তু করোনার জন্য এগুলোতেও দেখা দিয়েছে মন্দা। জেলার ২৪টি চা বাগান, ৩টি রাবার বাগান, বিস্তৃত হাওড়, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমা-কালেঙ্গা জাতীয় উদ্যান, খাসিয়া পুঞ্জি, গ্রিন ল্যান্ড পার্ক, শাহজীবাজার গ্যাস ফিল্ডে অবস্থিত ফ্রুটস ভ্যালি, সাগরি দীঘি, মহাগ্রাম বানিয়াচঙ্গ, সিপাহসালার সৈয়দ নাছির উদ্দিনের মাজর, শাহ সোলায়মান ফতেহ গাজীর মাজার, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত তেলিয়াপাড়া চা বাগানসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখন পর্যটকশূন্য।
হবিগঞ্জের সবছেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম হয় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। সেখানে নতুন করে চালু হওয়া ট্রি অ্যাডভেঞ্চার নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বছরের শুরুতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পিকনিক, শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ, দুই ঈদ ও বাংলা নববর্ষে এখানে পর্যটকের ঢল নামে। ওই সময়ে সেখানে রাজস্ব আদায় বেড়ে যায় বহুগুন। কিন্তু এবার করোনার জন্য সেখানে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ ও রমজানের ঈদে সেখানে কোনো পর্যটক আসেনি। কোরবানি ঈদেও পর্যটক আসা অনিশ্চিত।
সাতছড়ি ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তুহিন আহমেদ জানান, করোনার জন্য এ বছর কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব আয় কমেছে। যারা গাইড হিসাবে কাজ করেন তারাও বেকার হয়ে পড়েছেন।
ইউএসএইডের অর্থায়নে এবং বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিস (সিএনআরএস) বাস্তবায়নাধীন ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস্ অ্যান্ড লাইভিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের মাধ্যমে রূপ ৪ নামক একটি পর্যটনবিষয়ক গ্রুপের সহযোগিতায় সম্প্রতি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ট্রি অ্যাডভেঞ্চার নির্মিত হয়। ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সহব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি। কিন্তু এবার আয় কমে যাওয়ায় এর সাথে জড়িতদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। শুধু সাতছড়ি নয়, চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা জাতীয় উদ্যানেও নেই পর্যটক। চা বাগান দেখতেও আসছে না পর্যটক। ফলে পর্যটনকে কেন্দ্র করে যে ব্যবসা রয়েছে তা-ও বন্ধ।
এদিকে বর্ষাকালে জেলার হাওর এলাকায় নৌকা ভ্রমণও এবার চোখে পড়ছে না। প্রতিবছর নৌকা সাজিয়ে জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিথঙ্গল ও দিল্লির আখড়াসহ হাওরের সৌন্দর্য্য দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে যান। সূত্র: কালের কণ্ঠ
সানবিডি/ঢাকা/এসএস