দেশে ১ হাজার ৩১১টি শাখায় চলছে ইসলামী ব্যাংকিং

:: গিয়াস উদ্দিন ও সাখাওয়াত প্রিন্স || প্রকাশ: ২০২১-০৪-০৬ ২১:২১:০০ || আপডেট: ২০২১-০৪-০৬ ২২:২১:৩৮

সুদভিত্তিক ব্যাংকিং পরিহার করে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ও নব্বই শতাংশ মানুষ মুসলমান হওয়াতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে অগ্রহ ব্যাপক হরে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যুকৃত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং সেবাদানকারী ৮ টি ব্যাংক পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট দশ হাজার ৭৭৫ টি শাখার মধ্যে ১ হাজার ৩১১টি শাখা ইসলামী ব্যাংকিং সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১৯টি শাখায় পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম চলছে। একইসঙ্গে ১৪টি প্রচলিত বাণিজ্যক ব্যাংক ১৯৮ টি উইন্ডোর মাধ্যমে ইসলামিক আর্থিক পরিষেবা সরবরাহ করছে।

চলতি অর্থ বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে আমানত ও বিনিয়োগে যথাক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে ২.২৮% এবং ৩.৫৫% শতাংশ। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের রেমিট্যান্স এবং অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ১৯.২৪% এবং ডিসেম্বর শেষ তারল্যের সরবরাহ ছিল ৬০.৬১ শতাংশ।

পুঁজিবাজারের সব খবর পেতে জয়েন করুন 

Sunbd News–ক্যাপিটাল নিউজক্যাপিটাল ভিউজস্টক নিউজশেয়ারবাজারের খবরা-খবর

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ২২২ মিলিয়ন টাকা। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ৭২ হাজার ৯৭৩ মিলিয়ন বেশি যা শতাংশ হিসেবে ২.২৮ শতাংশ। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আমানত গত বছরের সেপ্টেম্বর তুলনায় ১৬.৬৬ শতাংশ বেশি ছিল।

ইসলামী ব্যাংকগুলো ডিসেম্বর শেষে মোট বিনিয়োগ ঋণ ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং ব্যাবস্থায় টাকার পরিমান ছিল ২৯ লাখ ৪০ হাজার ৯৩৬ মিলিয়ন। যা ঋণ ও স্বাভাবিক ব্যাংকিং খাতে সেপ্টেম্বর চেয়ে ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেড়েছে ৩.৫৫% ও ৮.০৯ শতাংশ।

অতিরিক্ত তারল্য ইসলামী ব্যাংকিং খাতে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ১৭৫ মিলিয়ন টাকা। অতিরিক্ত তারল্য সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ১ লাখ ১০ হাজার ৬৩৫ মিলিয়ন টাকা বেশি যা শতাংশ হিসেবে ৬০.৬১ শতাংশ। একইসঙ্গে গত বছরের ডিসেম্বর তুলনায় ২০২০ এর ডিসেম্বরে বেড়েছে দুইশত শতাংশের বেশি।

গত ২০১৯ সালের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ৪৬ শতাংশের বেশি এসেছে। যা ২০১৯ সালে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। অন্যদিকে গেল বছরের শেষে মোট রেমিটেন্সের প্রবাহের ৪০ শতাংশের বেশি মাধ্যম ছিল ইসলামী ব্যাংক। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সাধারণ ব্যাংকগুলোর তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি রেমিটেন্স এসেছে।

দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর শেষে রেমিটেন্স আহরণে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাধারণ ব্যাংকগুলোর ইসলামিক ব্যাংকিং শাখায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে এই মাধ্যমে রেমিটেন্স এসেছে ২৮৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সানবিডিকে বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ। এ কারণে কোনো কোনো প্রচলিত ধারার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়িক কৌশল বদলাতে চাইছে। আবার প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো যেখানে ৯০ টাকা দিতে পারে। এ ছাড়া প্রচলিত ধারার ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাড়ে ৫ শতাংশ হারে নগদ জমা সংরক্ষণ করতে হয়। অথচ প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ১৩ শতাংশ এসএলআর রাখার বাধ্যবাধ্যকতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য তা সাড়ে ৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলো যে কোনো সময় আমানতে মুনাফার হার পরিবর্তন করতে পারে। প্রচলিত ধারার ব্যাংক মেয়াদপূর্তির আগে যা পারে না। এসব কারণে প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকে ভালো মুনাফা হয়। ফলে অনেক ব্যাংক হয়তো ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ বিষয়ে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের সদস্য দ্বীন ইসলাম সানবিডিকে বলেন, বাংলাদেশে আসলে রিয়েল ইসলামী ব্যাংকিং হয় না। তার পরও মন্দের ভালো হলো ইসলামী ব্যাংকিং চলছে। বাংলাদেশের মানুষ একটু ধর্মভিরু হওয়া দিন দিন ইসলামী ব্যাংকিং এর প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান সানবিডিকে বলেন, করোনার মধ্যেও ইসলামী ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করেছে। এর পেছনে মুল কারণ হলো বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম। তারা পরকালের ভয় করে। ফলে মানুষ চেষ্টা করে একটু ইসলামীকভাবে চলা ফেরা করার জন্য।

তিনি বলেন, আগামীতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। বর্তমানে আমানত ও বিনিয়োগের চারভাগের একভাগ হলো ইসলামী ব্যাংকিং। আগামী পাঁচ বছরে এর পরিমাণ হবে ৫০ ভাগ। কারণ হলো বর্তমানে যেসব যুবক ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করছে তারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি ঝুঁকছেন।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন সানবিডিকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রতি মানুষের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো রিয়েল টাইম ব্যাংকিং। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের ২৩শ এর বেশি আউটলেট, ১৭৩ এর বেশি উপশাখা দিয়ে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে থাকে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকে কোন ধরণের ঝামেলা ছাড়া টাকা পাঠানো ও উত্তোলন করা যায়। কেউ যদি দেশে থেকে বলে আমি ব্যাংকে আছি টাকা পাঠান বা পাঠাও, এই সময়ের মধ্যে তারা টাকা তুলতে পারবে। অন্যদিকে আমাদের দেশের যারা মধ্য প্রাচ্যে যাওয়ার পর তারা এমনিতেই ধর্মভীরু হয়ে যায়। ফলে তারা ইসলামী ব্যাংকের প্রতি একটু আগ্রহী হয়।

বর্তমানে দেশে মোট ৬০টি তফসিল ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে আটটি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো রয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্‌, শাহ্‌জালাল ইসলামী, এক্সিম, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।

এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের। তালিকায় আছে বেসরকারি খাতের পূবালী, এবি ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক। আর সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর অনুমতি পেয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •