জয় হোক দর্শনের, জয় হোক মানবতার

|| প্রকাশ: ২০১৫-১১-১৯ ১১:২৭:০২ || আপডেট: ২০১৫-১১-১৯ ১১:২৭:০২

Hafizul

আজ নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার। বিশ্ব দর্শন দিবস। ২০০২ সাল থেকে জাতিসংঘের শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো প্রতি বছর নভেম্বর মাসের এই দিনটিকে বিশ্ব দর্শন দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। ইউনেস্কোসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। সকল মানুষকে দার্শনিক হিসেবে তৈরী করা নয় বরং দর্শনের মৌলিক চিন্তাগুলোর সাথে সকল মানুষের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই হচ্ছে এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

 দর্শনের মৌলিক ও সময়োপযোগী চিন্তার সাথে ধর্ম, বিজ্ঞান, মানবাধিকার, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইত্যাদির সমন্বয় করে দর্শনকে বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করাই হচ্ছে ইউনেস্কোর একমাত্র লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণকল্পে একক বছর এককটি নতুন বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে প্যারিসে দুই-তিন দিনব্যাপী সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোল টেবিল বৈঠক, ডায়ালগ আয়োজন করা হয়।

আজকে প্যারিসের সদর দপ্তরে যে বিষয়টি নিয়ে গোল টেবিল বৈঠক বা আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা হলো ‘ভাষার বহুত্ব এবং দর্শনের স্থান’। এ সিম্পোজিয়ামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ অংশ নিচ্ছেন। বিভিন্ন ভাষার দার্শনিকদের ভাবনা ও নৈতিক চিন্তাসমূহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে সকলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগসুত্র স্থাপন এবং দর্শনকে সার্বজনীন করাই হচ্ছে দর্শন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।

        এক সময়ে গ্রীক ভাষায় রচিত প্রাচীন দার্শনিকদের মহামূলবান গ্রন্থাবলী অন্য ভাষার লোকদের নিকট বহুকাল অপরিচিত ছিলো এবং মধ্য যুগে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিলো। আধুনিক যুগে অনুবাদের মাধ্যমে সেই পুরনো গ্রীক সাহিত্য ও দর্শন মানুষের কাছে পুনরায় ফিরে আসে এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক ধরনের নব জাগরণ ঘটে। প্রাচীন সংস্কৃত ও পালি ভাষায় লিখিত গ্রন্থাবলী এবং মধ্যযুগে আরবী, উর্দু, ফার্সী, ও জার্মান ভাষায় লিখিত ধর্ম দর্শন ও সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

 যদি প্রতিটি ভাষায় রচিত দার্শনিকদের গ্রন্থ এবং তাদের চিন্তাধারাকে অনুবাদের মাধ্যমে অন্য ভাষার সকলের নিকট বোধগম্য করা যায় এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তবে হয়ত; চিন্তা ও আদর্শের ক্ষেত্রে বহুভাষাভাষী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দুরত্ব কমে আসবে, অস্পষ্টতা অন্ধবিশ্বাস এবং ভুল ধারনার অবসান ঘটবে এবং মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে। তাই ইউনেস্কো এবার তিনটি বিষয়কে সামনে নিয়ে দর্শন দিবসের অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে।

প্রথমত, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অ-ইউরোপীয় দেশসমূহে জ্ঞান এবং দর্শন চিন্তার প্রসারণ; দ্বিতীয়ত, দর্শনকে একাডেমিক গন্ডীর বাহিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন ক্ষেত্র ও প্রক্রিয়া খুঁজে বের করা এবং তৃতীয়ত, দর্শনের শিক্ষা প্রদান এবং গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানিক ও আঙ্গিক বৈচিত্র্য আনয়ন। অর্থাৎ দর্শনকে শুধুমাত্র কাগজে কলমে বা তাত্ত্বিক জগতে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দর্শনের প্রয়োগ করা এবং দর্শনের শিক্ষাকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার উপায় ও প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবী। বিখ্যাত চিন্তাবিদ আবুল হাসিম তাইতো বলেছিলেন, বাস্তব জীবনের সাথে যে দর্শনের কোন সম্পর্ক নেই, তার কোন মূল্যও নেই।

        প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে পাশ্চাত্য দর্শনচিন্তা যে পরিমাণে বিস্তৃতি লাভ করেছে বা জনপ্রিয়তা পেয়েছে সে অনুপাতে প্রাচ্য দর্শন বা অন্যকোনো দর্শনচিন্তা ততোটা বিস্তৃতি লাভ করেনি বা মানুষ জানতে পারেনি। যেমন চীন জাপানের নৈতিক দর্শন, বাঙ্গালীর বাউল দর্শন, বৈষ্ণব দর্শন ও সুফী দর্শন, মুসলিম দর্শন, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি। বিভিন্ন ভাষার মানুষের দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধনের মধ্য দিয়েই একটি শান্তিময় বিশ্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। কুসংস্কার ও গোড়ামি থেকে মুক্ত হতে হলে দর্শন চর্চার কোনো বিকল্প নেই। অনেকে দর্শনকে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে মানুষের মুক্তচিন্তা ও স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করতে চায়। অথচ আধুনিক ব্রিটিশ দার্শনিক বাট্র্যান্ড রাসেল বলেন, দর্শন হলো ধর্মীয় সমস্যাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান।

 অর্থাৎ, ধর্মে যেসকল সমস্যার কথা বলা হয়েছে সেগুলোকে বৈজ্ঞানিক যুক্তির মাধ্যমে সাধারণের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরার মাধ্যমে বোধগম্য করাই দর্শনের কাজ। ঈশ্বর, আতœা, অমরত্ব, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, সত্য, সুন্দর, মঙ্গল, কল্যাণ, অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো যেমন ধর্মের মূল আলোচ্য বিষয় তেমনি দর্শনেরও।

           দর্শনের জনক হিসেবে পরিচিত থেলিস জগতের আদি সত্তা বিষয়ক একটি মৌলিক প্রশ্নের সমাধান করতে চেয়েছিলেন। পানি দর্শন সে প্রক্রিয়ারই অংশ। পরবর্তীতে পিথাগোরাস, হিরাক্লিটাস, এ্যানাক্সাগোরাস এবং ডাল্টনসহ অনেকে এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যান। সময়ের বিবর্তনে এবং জীবনের বৈচিত্র্যতার কারণে এখন দর্শন অনেক বেশি ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক সমস্যার সমাধানে ব্যস্ত।

 দর্শন এখন পরিবেশ বিপর্যয় এবং এর নৈতিক সমধান, ব্যবসায় নীতিবিদ্যা, জীব নীতিবিদ্যা, প্রাণী অধিকার, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, যুদ্ধ ও নৈতিকতা, কম্পিউটার ও সাইবার নীতিবিদ্যা, মানবাধিকার, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার নৈতিক সমাধান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যেমন মানুষের জীবন ও কর্মকান্ডে অভিনবত্ব এসেছে তেমনি দর্শন চিন্তার বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তন হয়েছে।

তাই এখন গর্ভপাত, পর্নোগ্রাফি, তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ ও অবৈধ ব্যবহার, কৃপাহত্যা, পরিবেশ সংকট, নারী-পুরুষ বৈষম, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য, এবং যুদ্ধ ও নৈতিকতার মতো প্রায়োগিক বিষয়গুলো দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাস ও অন্যায় যুদ্ধ প্রতিরোধে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পূণজাগরণের কোনো বিকল্প নেই। চারদিকে যেভাবে যুদ্ধের দামামা বাজছে ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব ক্ষণে ক্ষণে হুংকারের মধ্য দিয়ে আতংক ছড়াচ্ছে তাতে যেকোনো মুহুর্তে অনাকাঙ্খিত এবং অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্যোগের উদ্ঘীরণ ঘটতে পারে। তাই শান্তি দর্শন, অহিংস দর্শন, সহিষ্ণুতার দর্শন, মানবতার দর্শন, এবং অস্তিত্ববাদী দর্শনই পারে বিশ্বকে আলোর দিকে নিয়ে যেতে।

           জার্মান ভাষা দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন দর্শনে ব্যবহৃত ভাষার অস্পষ্টতা ও দূর্বোধ্যতা দূরীকরণের জন্য তাঁর ট্রাকটেটাসের সর্বশেষ বাক্যে বলেছিলেন, আমরা যে বিষয়ে আদৌ বলতে পারিনা বা স্পষ্ট করে বলতে পারিনা, অবশ্যই সে বিষয়ে নীরব থাকতে হবে। একথাটি শুধুমাত্র দর্শনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, বরং ধর্ম সাহিত্য রাজনীতি অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন।

কারণ, ব্যক্তির ভুল ও অস্পষ্টতা ধীরে ধীরে সংক্রামক ব্যধির মতো একটি জাতির ভবিষ্যতকে আক্রান্ত করতে পারে, বিনষ্ট করে দিতে পারে। ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যক্তির একান্ত ভ্রান্ত ও অনৈতিক ধারনাগুলো বিভিন্নভাবে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়ে যখন প্রতিষ্ঠিত সত্যের জগতকে বিভ্রান্তির ধু¤্রজালে জড়িয়ে ফেলে তখন অসংখ্য মানুষ এর ক্ষতির শিকার হয়। জগতে নেমে আসে অশান্তি, হানাহানি। তাই জীবনের প্রতিক্ষেত্রে আমরা যদি ভিটগেনস্টাইনের উপরিউক্ত একটি কথা অনুসরণ করতে পারি তবে হয়ত জগতে বিরাজমান অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

       ক্রান্তিলগ্নে আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো ইউনেস্কোর এ মহৎ উদ্যোগের সফলতা। কারণ ইউনেস্কোর এ প্রচেষ্টার সফলতা যেন বিশ্বমানবতার সফলতা। তাই জয় হোক দর্শনের, জয় হোক মানবতার।

             মোহাম্মদ হাফিজুল ইসলাম

সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।