রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজবাড়ীর গাছিরা

জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২০-১১-৩০ ১৬:০৭:৪২


শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কদর বেড়েছে খেজুর গাছের। হিমেল হাওয়া ও হালকা কুয়াশায় পশ্চিমের জেলা রাজবাড়ীতে এখন চলছে শীতের আমেজ। আর শীত মৌসুম শুরুর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। শুরু হয়েছে খেজুর রস আহরণ। এই রস আহরণে গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
শীত মৌসুমে আবহমান বাংলায় খেজুর রস আহরণ, খেজুর গুড় তৈরি আর নবান্নের উৎসব একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। আর খেজুর রসের পিঠা-পায়েস বাংলার উপাদেয় খাদ্য তালিকায় এখনও জনপ্রিয়। গাছিরা জানিয়েছেন, বছরজুড়ে অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে থাকলেও শীতকালে গাছিরা খেজুর গাছ রস আহরণের জন্য প্রস্তুত করেন। আর এসব গাছ থেকেই পুরো মৌসুমে পাওয়া যায় সুমিষ্ট রস। এ রস জ্বালিয়ে ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি তৈরি করা হয়।
জানা গেছে, খেজুরের গুড় থেকে একসময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হতো। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। খেজুর গাছের বৈশিষ্ট্য, যত বেশি শীত পড়বে তত বেশি মিষ্টি রস দেবে। আর শীতের সকালে খেজুর রস পান শরীর ও মনে প্রশান্তি এনে দেয়। এছাড়া এ থেকে বিভিন্ন ধরনের উপাদেয় খাদ্য তৈরি আবহমান বাংলার সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। খেজুরের নলেন গুড় ছাড়া শীত মৌসুমের পিঠা খাওয়াও যেন জমে না।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি এলাকার চল্লিশ বছর বয়সী বিল্লাল বলেন, “রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছি। শীত শুরুর আগেই আমরা নিজের ও অন্যদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে খেজুরের গাছ লিজ নিয়ে থাকি। এবারও নিয়েছি। মাঠে নতুন ধান কাটার পাশাপাশি খেজুর রস আহরণের প্রস্তুতি শুরু করেছি। এখন চলছে খেজুর গাছ চাছার কাজ। এরপর বাঁশের তৈরি বিশেষ খিল লাগিয়ে সংগ্রহ করা হবে ফোটায় ফোটায় রস।”
গাছিরা জানান, মাটির হাঁড়িতে খেজুর রস সংগ্রহ করা হয়। তবে আজকাল প্লাস্টিকের বোতলেও খেজুর রস আহরণ করেন গাছিরা। শীতের পুরো মৌসুমজুড়ে চলবে রস সংগ্রহের কাজ।
রাজবাড়ীর কালুখালি এলাকার গাছি রহমত জানান, “পরিবেশ বিপর্যয় আর এলাকার ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে খেজুর গাছ ব্যবহারের ফলে গাছের সংখ্যা কমে এসেছে। আগের মতো রসও হয়না। জমির আইলে যে খেজুর গাছ ছিল তাও হারিয়ে গেছে। এখন গাছে বাঁশের খিল লাগানোর কাজ চলছে। অল্পদিনের মধ্যেই রস আহরণ শুরু হবে।”
তিনি আরো বলেন, “আমাদের দেশে খেজুরের পরিকল্পিত আবাদ তেমন নেই। উপরন্তু নির্বিচারে খেজুর গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, যা পল্লি বাংলার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। খেজুর গাছ থেকে শুধু সুমিষ্ট রস ও গুড়ই হচ্ছে না, প্রাকৃতির ভারসাম্য সুরক্ষায় খেজুর গাছের আবাদ সম্প্রসারণ জরুরি।”
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাচীনকাল থেকেই খেজুর গুড়ের জন্য গ্রামবাংলা বিখ্যাত। দিনবদলের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি খেজুরের রস সংগ্রহ এবং পাটালি গুড় তৈরির পদ্ধতি। তাই শীতের আগমনী বার্তা জানান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এখানকার ‘গাছিরা’ প্রস্তুতি নেন খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের। এজন্য প্রথমেই খেজুর গাছ কেটে পরিষ্কার করেন তারা। এরপর শুরু হয় রস সংগ্রহ।
চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে মাটির ভাঁড়ে (কলসি) রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়। সূর্য ওঠার আগেই তা আবার গাছ থেকে নামিয়ে আনেন গাছিরা। পরে এই রস মাটির হাঁড়িতে কিংবা টিনের তৈরি কড়াইয়ে জ্বালিয়ে তৈরি হয় গুড়-পাটালি। ইতোমধ্যে জেলার নানা জায়গায় শুরু হয়েছে সেই প্রক্রিয়াও।
তবে জেলার অনেক গ্রাম ঘুরেও এখন আর দেখা মেলেনা সারি সারি খেজুর বাগান। নতুন ধান ঘরে তোলার সঙ্গে গ্রামে শুরু হয়না নবান্ন উৎসব। ঐতিহ্যের হাত ধরে একসময় যে বাংলার ঘরে ঘরে নবান্নের সঙ্গে পিঠাপুলি খাওয়ার আয়োজন চলত, গ্রামজুড়ে তা বিলীন হওয়ার পথে।
সানবিডি/নাজমুল/০৪:০৭/৩০.১১.২০২০