রাজবাড়ীর দেড়শো বছর বয়সী মঠ সংরক্ষণের দাবী

জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২০-১২-০৫ ১৩:১০:৪৫


রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাচুরিয়ার মুকুন্দিয়ায় অবস্থিত তৎকালীন জমিদার দ্বারকানাথ সাহা চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর জ্ঞানোদা সুন্দরীর সমাধি সৌধের উপর তৈরী প্রাচীনতম দুটি মঠের একটি ধসে পড়েছে কিছুদিন আগে। অবশিষ্ট মঠটি রক্ষণাবেক্ষন করতে স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মঠের চারপাশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি খনন করায় তা ধসে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, রাজবাড়ী সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর পাচুরিয়া ইউপির মুকুন্দিয়া বাজার সংলগ্ন মুকুন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত প্রাচীনতম দুটি মঠ। যার একটির উচ্চতা আনুমানিক প্রায় ১১০ ফুট। অপরটির উচ্চতা ছিল আনুমানিক প্রায় ৬০ ফুট। বড় মঠের ভিতর মাঝে স্মৃতিস্তম্বে খোদাই করে লেখা রয়েছে পরমারাধ্য পিতৃদেব দ্বারকানাথা সাহা চৌধুরী। জন্ম (বাংলা সন) বুধবার ১২ জ্যৈষ্ঠ ১২৪৪, মৃত্যু বৃহস্পতিবার ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২২। মঠের একপাশে পাকা সড়ক, আরেকপাশে বিশাল ডোবা রয়েছে। গত অক্টোবর দিবাগত গভীররাতে ৬০ ফুট উচ্চতার ছোট মঠটি ধসে ডোবায় পড়ে।

কোনাইল গ্রামের বাসিন্দা শত বছর বয়সী আহম্মদ আলী মল্লিক বলেন, “জমিদার দ্বারকানাথা সাহার মৃত্যু হলে যেখানে দাহ করা হয় তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানে প্রায় ১০০ ফুটের বেশি লম্বা মঠটি নির্মাণ করা হয়। আমার বড় বোন কোলে করে দেখাতে নিয়ে যেত। এর কয়েক বছর পর তাঁর স্ত্রী জ্ঞানোদা সুন্দীর মারা গেলে পাশেই দাহ করে সেখানেও পরিবার থেকে প্রায় ৬০ ফুট লম্বা মঠ নির্মাণ করেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর সবাই ৪০-৫০ একর জমি, বিশাল বাড়ি ফেলে কলকাতায় চলে যান। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর জমিদার দ্বারকানাথ সাহার এক ভাই এসে ঘুরে যান। তাঁদের ওই সব সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা কলেজের লাইব্রেরিয়ান মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, “মুকুন্দিয়ায় তৎকালীন জমিদার দ্বারকানাথ সাহার বিশাল বাড়ি ছিল। তাদের মৃত্যুর পর পরিবার থেকে দুটি মঠ নির্মাণ করেন। জমিদার পরিবারের নিজেদের এস.এন.সি নামক ইট দিয়ে নির্মাণ করা হয়। যেহেতু মঠ দুটি প্রাচীন ঐতিহ্য, স্মৃতি ধারণ করছে। এটা যাতে রক্ষা পায়, মানুষ-জন যাতে জানতে পারে। ইতিহাস রক্ষার্থে সরকারের কাছে জোরদাবী জানাচ্ছি। তা না হলে এই ইতিহাসও বিলীন হয়ে যাবে।”

মুকুন্দিয়া বাজারের ব্যবসায়ী ও নৈশ পাহারাদার রফিক খান বলেন, “গত ২২ অক্টোবর দিবাগত রাত দুইটার দিকে দোকানে বসে তিনি সহ আরো দুইজন পাহারাদার মিলে চা পান করছিলেন। এসময় হঠাৎ করে বিকট শব্দ হয়। কারণ খুঁজতে বাজারের চারপাশ ঘুরে দেখেন ছোট মঠটি ধসে ডোবায় পড়েছে।”

পাচুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মান্নান শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জমিদার দ্বারকানাথ সাহা এবং তার স্ত্রীর মৃত্যু হলে পরিবারের লোকজন স্মৃতির ওপর মঠ দুটি নির্মাণ করেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর তারা দেশ ছেড়ে চলে যান। তাদের রেখে যাওয়া বহু সম্পত্তি স্থানীয় একটি চক্র অবৈধভাবে ভোগ দখল করে আছে। বর্তমান ইউপি সদস্য মান্নান মীর মঠের বিশাল ডোবাটি দখল করে মাছ চাষ করছে।”

স্থানীয় ৫ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান মীর মাটি কাটার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “প্রতিপক্ষ গ্রুপের কিছু মানুষ এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ করছেন। মঠের চারপাশ দিয়ে আমার জমি। এখন পানি থাকায় মাছ চাষ করছি। দুই মাস পর পানি কমে গেলে ধান চাষ করবো। কি কারণে আমি মাটি কাটবো? বরং মঠ ধসে আমার জমিতে পড়ে আরো ক্ষতি হয়েছে।”

পাচুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আলমগীর হোসেন বলেন, “মঠ দুটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে কয়েকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরকে জানিয়েছি। এর আগে সাবেক জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম খান দেখে গেছেন, কিন্তু কোন ব্যবস্থা হয়নি। অনেক পুরাতন ও পাশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি খনন করায় ছোট মঠটি ধসে গেছে।”

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, “এ ধরনের বিষয় আমার জানা নেই। এলাকাবাসী প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষন করতে লিখিতভাবে আবেদন করলে আমি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে পুরাকৃতি সংরক্ষণ দপ্তরে পাঠিয়ে দেব।”

সানবিডি/নাজমুল/০১:১০/০৫.১২.২০২০