‘ফলের ঝুড়ি’ আয়োজিত রচনা প্রতিযোগীতায় প্রথম হলেন স্মৃতি

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২১-০৬-০৬ ১৬:২৫:৫৮ || আপডেট: ২০২১-০৬-০৬ ১৭:২৪:১৬

নাটোরের বনপাড়ার দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাহসিন বারী সুহা। তিনি বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফলমুল,মাছ এবং কৃষিজ পণ্যের সফল অনলাইন উদ্যোক্তা।তিনি একটি অনলাইন পেজের মাধ্যমে পণ্যের প্রচারণা এবং ডেলিভারির কাজ করে থাকেন। তার এই পেজের নাম ‘ফলের ঝুড়ি’।এই পেজের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা দিবসের উপরে একটি রচনা প্রতিযোগীতার আয়োজন করেন।এই রচনা প্রতিযোগীতায় ‘নিভৃতে’ প্রবন্ধটি লিখে প্রথম স্থান অধিকার করেন সাজেদা সুলতানা স্মৃতি। তার গল্পটি এখানে তুলে ধরা হল।

‘নিভৃতে’

সাজেদা সুলতানা স্মৃতি

রাগের চোটে কলিং বেল ক্রমাগত বাজিয়ে যাচ্ছিলাম। দরজা খুলে দিলেন আন্টি, আমি থমথমে গলায় বললাম- “রাফি ভাইয়া বাসায়?” উনার চেহারায় বিস্মিত ভাব লুকানোর চেস্টা না করেই বললেন,”হ্যা, ভেতরে এসো!”না আন্টি! উনাকে ডেকে দেন। রাফি ভাইয়া এলেন এক্টুপরেই, তিনি কিছু বলার আগেই বললাম- আপনি বাবাকে বলেছেন,বাংলা গান আপনার পছন্দ না? রাফি ভাইয়া শুকনো গলায় বললেন-” হ্যা! ওভাবে না ঠিক!”

আমি ঠান্ডা গলায় বললাম- “কিভাবে তা জানতে চাইনি! আমি দুই মিনিট সময় নেব রাফি ভাই, প্লিজ শুনবেন। বাংলার প্রতি আপনার টান না থাকতে পারে, আমিও জানি নেই, গিটার বাজান ঠিক,দিনরাত হিপহপ গান নিয়ে পড়ে থাকেন। কখনো রবীন্দ্রসংগীত শোনেন নি, ভাটিয়ালি গানের সাথে পরিচয় নাই আপনার, খুব স্বাভাবিক বাংলা আপনার নিজের ভাষা নয় বলেই এটা আপনাকে টানবেনা! কিন্তু….. ” আমি দম নিলাম! রাফি ভাই ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছেন!

“কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধার সামনে বাংলা গান পছন্দ না এটা বলা রীতিমত অপমানজনক! আপনারা বিহারী, আপনাদের এই বাসায় থাকতে দেয়া নিয়ে এলাকায় বাবা অনেক তিরস্কার সয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কি করে তিনি এটা করলেন! আমরাও নারাজ ছিলাম! বাবা শুধু বলেছেন, “ওরা তো দোষ করেনি!আমি বিহারী ভেবে না, মানুষ ভেবেই দিয়েছি!” এলাকার গণ্যমান্য অনেকেই বাবার সাথে মেশা ছেড়ে দিয়েছে এজন্যই!  অথচ! বাবা ভুল করেছেন, অকৃতজ্ঞতা রক্তে মিশে আছে আপনাদের। আপনি যদি ভদ্রভাবে মিথ্যে করে বলতেন, গলা বসে আছে,বা সিক,তাহলেও চলতো, বাবা অন্তত কষ্ট পেতেন না! ভাববেন না, আপনাদের কেউ বাসা থেকে তাড়িয়ে দেবেনা।  যেতেও হবেনা আপনাদের। কারন যুদ্ধের সময় আপনার বিহারী চাচা বাবাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন, মিলিটারিদের হাতে তুলে দেন নি, সে কৃতজ্ঞতায় আমার বাবা মানুষের নিন্দের ধার ধারেন না। এত কিছু বলে ফেলার জন্য দু:খিত!  বিশেষ যেটা বলতে এসেছি, সেটা হল, আমি চাইনা প্রোগ্রামে আপনি কোনোভাবেই থাকেন, থাকলেই সবাই চাইবে আপনি একটা গান যেন শোনান!  অন্তত স্বাধীনতা দিবসের প্রোগ্রামে আমি অন্য ভাষার গান শুনতে চাইনা! প্লিইইজ! ”

রাফি ভাইয়ের হতভম্ব দৃষ্টির সামনে দিয়েই আমি সিড়ি ভেংগে উপরে চলে গেলাম! বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে! না ভাষার অপমানে! বুঝতে পারছিলাম না! পরেরদিনের প্রোগ্রামে আমার বিরক্তির সীমা রইলোনা।  রাফি ভাই গিটার নিয়ে হাজির! এ কি শোধ তুলতে এসেছে? জনা পঞ্চাশেক লোকের সামনে যদি আজ সে বলে বসে বাংলা গান পছন্দ না! বাবা মিশে যাবে আজ নিন্দার ঝড়ে! বিহারীকে আরো আশ্রয় দাও!!

পুরো সন্ধ্যা কেটে গেল ভালোয় ভালোয়। রাফি ভাই যে কেউ গান গাইতে বলছেনা,এতেই আমি খুশি। কিছু টোকাই আমন্ত্রিত ছিল।ভরপুর খাওয়া দাওয়া হবে, দোয়া করা হবে। হঠাত করেই রাফি ভাই গিটারের টুংটাং আওয়াজ তুললেন! আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি!

জাতীয় সংগীত অনেকবার শুনেছি!  কখনোই গিটারের আওয়াজে শোনা হয়নি এমন! অন্তত এমন পরিবেশে তো নয়ই! রাফি ভাইয়ার আওয়াজে কিছু ছিল! মাদকতায় ভরে গেল পুরো আসর! সবাই দাঁড়িয়ে গেল!আমি আড়চোখে দেখলাম বাবা কাদছে! কখন জানিনা আমার চোখ ও ভিজে উঠেছে!! একরাতেই এই প্রাক্টিস সম্ভব না। কখন যে আমার গাল ভিজে গেছে খেয়ালই করিনি!!

রাফি ভাইয়ের পরিবেশনা শেষে সব নিস্তব্ধ! কেউ কেউ বাবাকে বাহবাও দিচ্ছেন! ছেলেটা নিপাট বাংগালীইই!!

কখন যেন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ভাইয়া!  মৃদু গলায় বললেন, “গাইতে চাইনি কারন এই স্বাধীনতা দিবস কেন্দ্রিক প্রোগ্রামে একজন বিহারী গাইছে, এটা দেখে তোমার বাবাকে যদি আবার কথা শুনতে হয়! এদিকে মানুষ তো আমাকে অকৃতজ্ঞ ভেবে বসে আছে! বোকা মেয়ে! বাংলা ভাষায় কথা বলি,গান কেন পছন্দ করবোনা? এটা তো এখন আমারো ভাষা!খুব নিচুগলায় প্রাক্টিস করতাম অবশ্য! তো? বিহারীর কাছে ছোট হওয়ায় কি সে এখন কাদছে?”

আমি চোখের পানি না লুকিয়েই বললাম- “আমি কোন বিহারীর জন্য কাদছিনা! আমি সেই মানুষটার কাছে হারার আনন্দে কাদছি যে আমার ভাষাকে সম্মান করে!”

সাজেদা সুলতানা স্মৃতি

স্বত্তাধিকারী -Simuan’s

(হ্যান্ডপেইন্ট, কাতান ও দেশীয় শাড়ির উদ্যোগ)

সানবিডি/ফাহমিদ জামান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •