দুঃসময় বলতে কিছু নেই.. সকলই কেবল সময়
আপডেট: ২০১৬-০১-১৭ ২২:২০:২১
অনেক কষ্টে আম্মাকে রাজী করিয়ে গিয়েছি আলিফ লায়লা দেখতে। দীর্ঘ দিবস রাত্রির অবসান। প্রবল উত্তেজনায় দম বন্ধ করে বসে আছি। এই তো সেই গা শিউড়ানো মিউজিক শুরু হল বলে, ‘কত যুগ পেরিয়ে গেছে, নতুন তবু রয়ে গেছে, জ্বীনকে ধরে এনেছে, পরীকেও বেঁধে রেখেছে… আলিফ লায়য়য়লা…’
কিন্তু বিজ্ঞাপনের পর বিজ্ঞাপনে আলিফ লায়লা শুরু হতে দেরী হচ্ছে। বিজ্ঞাপন শেষে আজান, আজান শেষে সংবাদ, সংবাদ শেষে বিশেষ সংবাদ, বিশেষ সংবাদ শেষে আবার বিজ্ঞাপন, সেই বিজ্ঞাপন শেষে আলিফ লায়লার মিউজিক। আমি দমবন্ধ করে বসে আছি। হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার অবস্থা! ইশ! অবশেষে! অবশেষে! মিউজিক শেষ হবার সাথে সাথেই শুরু হল আলিফ লায়লা,- সিন্দবাদ আসছে,কেহেরমান অপেক্ষায়… রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা… উফ!.. ধুপ করে শব্দ হল, ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে!
২.
ভোরে উত্তরপাড়ার সাথে ক্রিকেট খেলা। তারপর বহুদিন আর খেলা ধুলা হবে না। গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে দূরে। সারারত জেগে আছি। উত্তেজনায় ঘুমাতে পারছি না, কখন সকাল হবে! কখন মাঠে যাব, কখন খেলব! আহ! ভোর! ভোর হয়েছে, আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। খেলা শুরু হবার আগে চরাচর ভাসিয়ে দেয়া তুমুল বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টি!
৩.
পরীক্ষা দিতে গেছি। সবগুলো চ্যাপ্টার শেষ করে গেছি। একটামাত্র চ্যাপ্টার বাদে। এই চ্যাপ্টার থেকে কখনোই কোন প্রশ্ন আসে না। হলে গিয়ে দেখি ৫ প্রশ্নের ৩ খানা এসেছে সেই চ্যাপ্টার থেকেই!
৪.
জরুরী তাড়া আছে। সিএনজি ভাড়া করেছি তিনগুন ভাড়ায়। পথে পরপর ৩ সিগন্যাল। সিগন্যালে প্রতিবারই আটকে যাওয়া সর্বশেষ যান আমার। প্রতিবার সিগন্যাল আটকে সুদীর্ঘ সময়। সবশেষে রেলক্রসিং পার হবার ঠিক আগ মুহূর্তে ট্রেন যাবে। সর্বশেষ আটকে যাওয়া মানুষটা আমি!
৫.
২০১২ তে এক লোভনীয় বেতনের প্রকল্পের জন্য পরীক্ষা দিয়েছি। মোট পরীক্ষার্থী থেকে ৬ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবে। আমি ষষ্ঠ হয়েছি। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আগের জব ছেড়ে দিয়েছি। নেক্সট মাসের ১ তারিখে জয়েন। তার এক সপ্তাহ আগে প্রকল্প অফিস থেকে ফোন দিয়ে জানালেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের বাজেট কর্তনের কারণে আমরা আপাতত ৫ জনকে নিতে পারছি। দুঃখিত। তবে আশাহত হবেন না, যতদ্রুতসম্ভব আপনাকে ডাকা হবে। একটু অপেক্ষায় থাকুন। এই সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত’। আমি জানি, তারা আমাকে আর কখনোই ডাকবেনা। আমি ফোন কানে চেপে ধরে হাসি। এই হাসিরা অদ্ভুত। ভারি অদ্ভুত!
৬.
লঞ্চে বাড়ি যাব। ৮ টায় লঞ্চ ছাড়ার টাইম। তবে কখনও নির্ধারিত সময় ছাড়ার রেকর্ড নেই। কুড়ি পচিশ মিনিটের নিয়মিত বিলম্ব। সেদিন ৯ মিনিট লেট করেছি। গিয়ে দেখি ঠিক ৬ মিনিট আগে লঞ্চ ছেড়ে গেছে!
৭.
মামা ১০০ টাকা দিয়েছেন। একজীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, একটা ফুটবল!আহা! কত কত দিনরাত্রির স্বপ্ন! কত কত অপেক্ষা। ৬মাইল পায়ে হেঁটে গিয়ে ফুটবল নিয়ে ফিরেছি সন্ধ্যায়। রাতে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছি। নাক ঘষে সুবাস নিয়েছি সারারাত। বিকেলে খেলতে নেমেছি। কে যেন সজোরে মেরেছে। মাঠের পাশের খেজুর গাছের তীরের তীক্ষ্ণ ফলার মত গোটা দশেক কাঁটায় ফুটবল বিঁধে আছে। হাওয়া বের হওয়া চিপসানো ফুটবলখানা বুকের ভেতর চেপে ধরে বসে রইলাম। বুকের ভেতর থইথই কান্না চেপে ধরে শুকনো খটখটে ক্লান্ত চোখে বসে রইলাম।
এখনও বসে আছি। বুকের ভেতর থইথই কান্না চেপে ধরে খটখটে শুকনো চোখে। জীবন মহার্ঘ্য, এখানে রোজকার দিন নতুন সম্ভাবনার। দুঃসময় আর দুর্ভাগ্যকে শক্ত পায়ে পিছে ফেলবার। প্রিয় সময়, তুমি যতই উল্টো চলো না কেন, আমি জানি, দুঃসময় বলতে আসলে কিছু নেই। সকলই কেবল সময়, সকলই কেবল দৃঢ় আর সংকল্পবদ্ধ হবার নতুন উপলক্ষ। আমি তোমার সঙ্গী নয়, তোমাকেই আমার সঙ্গী করব, আমার সঙ্গী তোমাকে হতেই হবে… হতেই হবে।
এই লেখকের লেখা নিয়মিত পড়তে চাইলে ফেসবুকে লাইক দিন Facebook






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














