প্রতিবছর বর্ষায় ধসে যাচ্ছে পাহাড়
জেলা প্রতিনিধি আপডেট: ২০২১-০৭-০৫ ২১:২৬:৪১
কয়েকদিনের টানা বর্ষণে রাঙামাটিতে শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-মাঝারি ধরনের পাহাড়ধসের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শহরের রিজার্ভ বাজারের কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী এবং প্রধান সড়কের সঙ্গে লাগোয়া পাহাড়ধসে খাদে পড়ে পাঁচ দোকান বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
সোমবার (৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্থাপনাগুলোর ধসের ঘটনাটি ঘটে। তবে সতর্কতা অবলম্বন না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দোকানিরা জানান, হঠাৎ বিকট শব্দে ধসে গিয়ে দোকানগুলো কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী পাহাড়ি খাদে পড়ে ভেঙেচুরে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ধসে যাওয়ার আগ মুহূর্তে টের পেয়ে তাৎক্ষণিক দোকান থেকে বেরিয়ে দ্রুত সরে গিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছেন দোকানে থাকা লোকজন। এ ঘটনায় লোকজন হতাহত না হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান দোকান ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সংলগ্ন এলাকার আবাসিক হোটেল মতিমহলের মালিক শফিউল আজম, ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক মো. হেলাল, সেলিম রেজা ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা মো. খোরশেদ আলমের দাবি- তাদের দোকানের নিচে কাপ্তাই হ্রদ দখল করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ যে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করছে, সেটির ব্যাজ ঢালাই এবং প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণে মাটি কাটার ফলে ওই ধসের ঘটনাটি ঘটল। কারণ এর আগে এতটা বছর ধরে কোনোবারই এ ধরনের ধসের ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে পাল্টা যুক্তি দিয়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুছা মাতব্বর বলেন, ভবনটি জেলা পরিষদের নিজস্ব জায়গায় নির্মাণ করা হচ্ছে। সেটি টেকসই এবং নিরাপদ। ভবনটি নির্মাণে ওই জায়গা থেকে এক ইঞ্চি মাটিও কাটা হয়নি। আসল বিষয় হচ্ছে- দোকানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কোনো প্রকার মেরামত করা হয়নি। ফলে হঠাৎ ধসের ঘটনাটি ঘটেছে। আর ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে ব্যাপক জনস্বার্থে, যা ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ ওই ৫টি দোকান ধসে যাওয়ার সময় বিকট আওয়াজ শুনতে পান তারা। এতে আশেপাশের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেন। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। এ কারণে দোকানের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে।
রাঙামাটি পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর করিম আকবর বলেন, দোকানগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। অনেক আগে থেকে দোকানদারদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। আগে দোকানগুলো থেকে মালামাল সরিয়ে নিয়ে গেলে হয়তো এতবড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটতো না।
ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে তদন্তে এসেছি। পরবর্তীতে করণীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা বেলাল হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ৯টায় দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থল গিয়ে বিধ্বস্ত দোকানগুলো অপসারণ করে মালামাল উদ্ধারে সহায়তা করছি।
রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার ওসি মো. কবির হোসেন জানান, খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনাস্থল গিয়ে দেখি, বিধ্বস্ত দোকানগুলোর আশেপাশে লোকজনের ভিড়। তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। দোকানগুলো ছিল রির্জাভ বাজার ঢুকতেই প্রধান সড়কে লাগোয়া। দোকানগুলো ধ্বসে যাওয়ায় বর্তমানে সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। তাই লোকজনকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে জেলা প্রশাসন সূত্রে বলা হয়েছে, রাঙামাটি শহরসহ জেলায় ৫ হাজারের অধিক পরিবারের লোকজন পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাঙামাটি শহরে ৩৩ স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ওইসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লোকজনকে বসবাসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে বারবার নিরাপদে সরে যেতে বলা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইনগতভাবে নিরাপদে সরে যেতে বাধ্যতামূলক করা হবে। রাঙামাটি পৌর এলাকায় ২৩ আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী অফিসাররা যার যার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
প্রতিবছর বর্ষায় সদরসহ জেলায় কোথাও না কোথাও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের দুর্যোগে ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তী ২০১৮ সালের জুনে জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে ২ শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের জুনে জেলার কাপ্তাইয়ে তিন জনের প্রাণহানি ঘটেছে। সতর্কতা অবলম্বন না করলে যে কোনো সময় ফের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













