বাংলার নারীদের নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভাষা হিজাব

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২১ ১৭:৩৩:৪২ || আপডেট: ২০১৬-০১-২১ ১৭:৩৩:৪২

resize_1450969010লুতফুন নাহার লতা আমার একজন প্রিয় অভিনেত্রী। তিনি সম্প্রতি ফেইসবুকে শহীদ মিনারে হিজাব পরিহিতা কয়েকজন তরুণীর একটা ছবি দিয়ে দেশ নিয়ে মারাত্মক হতাশা প্রকাশ করেছেন এমনকি নিজের মরদেহ দেশে আনতে বারণ করে দিয়েছেন তাঁর সন্তানকে।

লুতফুন নাহার লতাকে অপহরন করে রাজনৈতিক অস্থিরতার যেই পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে সেটা ধর্মবাদিরা করেনি; করেছিল আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজের উপর তলার মানুষেরা। সেই ঘটনা বাস্তবায়িত হলে লুতফুন নাহার লতার জীবনাশঙ্কা ছিল। সেই ভয়ানক ঘটনার চাইতে কয়জন তরুণীর হিজাব পরিধান কেন তাঁর আতঙ্কের কারণ হল সেটা আমি বুঝতে পারিনি।

তাঁর পর্যবেক্ষণটি যথাযথ যে সম্প্রতি হিজাবের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু কেন বেড়েছে সেই সংক্রান্ত তাঁর আশংকা নেহায়েতই ভ্রান্ত। ধর্মীয় চিহ্ন ব্যবহার বা ধর্মীয় রেটরিক ব্যবহার বাংলাদেশের একচেটিয়া নয়। অনৈতিক যুদ্ধকে নৈতিক ভিত দেয়ার জন্য বুশ প্রথম “ক্রুসেড” বা ধর্মযুদ্ধ শব্দটা ব্যবহার করেন। তিনি স্পষ্ট ভাবেই ঘোষণা করেন এই যুদ্ধটা ধর্মের যুদ্ধ।

ধর্মীয় চিহ্ন পরিধান কীভাবে প্রতিবাদের তরিকা হতে পারে সেটা সাব অল্ট্রান স্টাডিজের গৌতম ভদ্র তাঁর “ইমান ও নিশান” বইয়ে পূর্ববঙ্গের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস ঘেঁটে দেখিয়েছেন।

Pinaki Vatyacharja
ডা. পিনাকী ভট্টচার্য

বাংলাদেশের নারীরাও তাদের প্রতিবাদ কীভাবে ব্যক্ত করেছে সেটার ইতিহাস জানা থাকলে হিজাব পরিধানের একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা তিনি দাড় করাতে পারতেন বলে আমার মনে হয়।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মে নারীর যখন বেদ পাঠের অধিকার ছিল না তখন বাংলার নারীরা ধর্মাচারের নিজস্ব পদ্ধতি আবিস্কার করেছিল যার নাম “ব্রত”। এই ব্রতের জন্য কোন পুরুত লাগেনা, কোন মন্ত্রও নেই, কোন সুনির্দিষ্ট আচারও ছিল না। এই “ব্রত” ছিল বাংলার নারিদের নিঃশব্দ প্রতিবাদ।

ব্রিটিশ শাসনে বাংলার সমাজ যখন বিধ্বস্ত আমরা পুরুষেরা যখন ব্রিটিশ আধিপত্য মেনে নিয়েছি, ব্রিটিশ পোশাক পরে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করছি তখন বাংলার নারীরা সাংস্কৃতিক চিহ্ন “শাড়ি” কে আঁকড়ে ধরেন। আমরা লুঙ্গি/ধুতি ত্যাগ করলেও নারীরা “শাড়ি” ছাড়েননি।

লুতফুন নাহার লতার উচিৎ ছিল, নারীরা প্রতিরোধের কোন বার্তা দিচ্ছে সেটার অনুসন্ধান করা।

আধুনিকতার নামে পশ্চিম যে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে মুসলিম বিশ্বের উপরে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আর সংগ্রামের প্রত্যেকটা চিহ্নের উদ্ঘাটন একটা বিপ্লবী কর্তব্য। অবচেতনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের পক্ষে আপনার মতো শিল্পীদের দাড়িয়ে যাওয়া মানায় না।

বাংলার নারীদের এই নিঃশব্দ প্রতিবাদকে বুঝতে হলে কিছুটা সংবেদন থাকতে হবে আর ইতিহাসের পাঠ ও নিতে হবে। আর দেশটা শুধু আপনারই নয় প্রিয় শিল্পী, দেশটা সমানভাবে ওই তরুণীদেরও।