মেট্রোরেল-বিআরটির নির্মাণ ব্যয় মেটাতে হবে যাত্রীদের

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২১ ১৯:৫৬:২৯ || আপডেট: ২০১৬-০১-২১ ১৯:৫৬:২৯

downloadরাজধানীতে একটি মেট্রোরেল ও একটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণ শুরু করা হচ্ছে। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) সুপারিশ রয়েছে আরো চারটি মেট্রোরেল ও একটি বিআরটি নির্মাণের। এতে বিনিয়োগ করতে হবে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা।

এ নির্মাণ ব্যয় তোলা হবে মেট্রোরেল ও বিআরটির যাত্রীদের কাছ থেকেই। এজন্য মেট্রোরেলের ন্যূনতম ভাড়া হবে ২৫ টাকা এবং বিআরটিতে সাড়ে ১৪ টাকা। তবে বাস্তবায়ন বিলম্ব ও ব্যয় বাড়লে ভাড়াও বাড়বে। আরএসটিপির চূড়ান্ত খসড়ায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। জনমত যাচাইয়ের জন্য খসড়া প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মেট্রোরেল ও বিআরটির ভাড়া অনেক কম। তবে দাতাদের শর্তের কারণে ঢাকায় এ ভাড়া অনেক বেড়ে যাবে। এতে কমে যেতে পারে মেট্রোরেল ও বিআরটির যাত্রী। তাই সরকারের উচিত হবে নির্মাণ ব্যয় ভর্তুকি আকারে দেয়া। এতে আধুনিক এ গণপরিবহনগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়বে।

আরএসটিপির খসড়ার তথ্যমতে, উত্তরা-মতিঝিল রুটে নির্মিতব্য মেট্রোরেলের জন্য ভাড়া নিয়ে ২০১২ সালে সমীক্ষা চালায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। সমীক্ষা অনুযায়ী, মেট্রোরেল নির্মাণে সময় লাগবে ১০ বছর। এর পর ৩০ বছরে জাইকার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ফলে মেট্রোরেল পরিচালনা ব্যয়ের সঙ্গে নির্মাণ ব্যয়ও তুলতে হবে। ভাড়ার হার নির্ধারণে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে কোনো ধরনের ভর্তুকি ছাড়াই ২০৪২ সাল নাগাদ সরকার জাইকার ঋণ পরিশোধ করতে পারবে।

এ হিসাবে ২০২৫ সালে মেট্রোরেলে ন্যূনতম ভাড়া হবে ২৫ টাকা ৪০ পয়সা। এর মধ্যে নির্মাণ ব্যয় বাবদ নেয়া হবে ২২ টাকা ৬০ পয়সা ও পরিচালনা ব্যয় বাবদ ২ টাকা ৮০ পয়সা। পরিচালনা ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি ও নির্মাণ ব্যয় স্থির। ফলে মেট্রোরেলে এক কিলোমিটার ভ্রমণ করলে ভাড়া হবে ২৫ টাকা ৪০ পয়সা, পাঁচ কিলোমিটারে ৩৬ টাকা ৬০ পয়সা ও ১০ কিলোমিটারে ৫০ টাকা ৬০ পয়সা।

২০২১ সালে মেট্রোরেল চালু হলে নির্মাণ ব্যয় বাবদ ২০ টাকা ও পরিচালনা ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫০ পয়সা হারে পরিশোধ করতে হবে। এতে এক কিলোমিটারে ভাড়া হবে ২২ টাকা ৫০ পয়সা, ৫ কিলোমিটারে ৩২ টাকা ৫০ পয়সা ও ১০ কিলোমিটারে ৪৫ টাকা।

সময়ের সঙ্গে বাড়বে ভাড়ার এ হার। ২০৩৫ সালে মেট্রোরেল ভ্রমণে এক কিলোমিটারে ভাড়া হবে ৩৪ টাকা ৪০ পয়সা। এর মধ্যে নির্মাণ ব্যয় বাবদ নেয়া হবে ৩০ টাকা ৬০ পয়সা ও পরিচালন ব্যয় বাবদ ৩ টাকা ৮০ পয়সা। ফলে মেট্রোরেলে পাঁচ কিলোমিটারে ভাড়া দাঁড়াবে ৪৯ টাকা ৬০ পয়সা ও ১০ কিলোমিটারে ৬৮ টাকা ৬০ পয়সা।

ঢাকা গণপরিবহন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্ভাব্য ভাড়া বিশ্লেষণ করে জাইকা। তবে সেটা চূড়ান্ত নয়। মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকার একটি কমিটি গঠন করবে। বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে তারাই ভাড়া নির্ধারণ করবে।

উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নয়াদিল্লিতে শক্তিশালী মেট্রোরেল ব্যবস্থা রয়েছে। এর আওতায় শহরব্যাপী ছয়টি লাইন রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ২১৩ কিলোমিটার। তবে দিল্লি মেট্রোতে ভাড়া অনেক কম। এক্ষেত্রে ন্যূনতম ভাড়া ৮ রুপি, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৯ টাকা ৩০ পয়সা। ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত একই ভাড়া। এর পর প্রতি কিলোমিটারের জন্য অতিরিক্ত এক রুপি হারে ভাড়া দিতে হয়। আর দিল্লি মেট্রোতে সর্বোচ্চ ভাড়া ৩০ রুপি।

আরএসটিপির তথ্যমতে, গত বছর গাজীপুর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত নির্মিতব্য বিআরটির ভাড়া নিয়ে সমীক্ষা চালায় বিশ্বব্যাংক। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিআরটি নির্মাণে সময় লাগবে তিন বছর। এর পর ১২ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এ হিসাবে ২০২৫ সালে বিআরটির ন্যূনতম ভাড়া হবে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা। এর মধ্যে নির্মাণ ব্যয় বাবদ ৯ টাকা ৯০ পয়সা ও পরিচালনা ব্যয় ৪ টাকা ৫০ পয়সা। এক্ষেত্রে পরিচালনা ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি ও নির্মাণ ব্যয় স্থির। ফলে বিআরটিতে পাঁচ কিলোমিটারে ভাড়া হবে ৩২ টাকা ৪০ পয়সা ও ১০ কিলোমিটারে ৫৪ টাকা ৯০ পয়সা।

বিআরটির ভাড়াও বাড়বে সময়ের সঙ্গে। ২০৩৫ সালে বিআরটিতে এক কিলোমিটারে ভাড়া হবে ১৯ টাকা ৫০ পয়সা। এর মধ্যে নির্মাণ ব্যয় ১৩ টাকা ৪০ পয়সা ও পরিচালনা ব্যয় ৬ টাকা ১০ পয়সা। আর বিআরটিতে পাঁচ কিলোমিটারে ভাড়া হবে ৪৩ টাকা ৯০ পয়সা ও ১০ কিলোমিটারে ৭৪ টাকা ৪০ পয়সা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আহমেদাবাদ বিআরটির ভাড়া অনেক কম। সেখানে বিআরটিতে প্রতি দেড় কিলোমিটারের জন্য ভাড়া দিতে হয় ৫ রুপি, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ টাকা। এতে ২০ কিলোমিটার ভ্রমণে ভাড়া পড়ে ৬৭ রুপি।

সাধারণ রেলওয়ের ভাড়ার সঙ্গে মেট্রোরেলের ভাড়া তুলনা করে আরএসটিপিতে বলা হয়েছে, রেলওয়ের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ৩৬ পয়সা হলেও স্টেশনে যেতে অনেক সময় নষ্ট হয়। আবার ট্রেনের জন্য কমপক্ষে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এতে অনেক সময় অপচয় হয়। একই ধরনের যুক্তি দেয়া হয়েছে বিআরটির ভাড়ার ক্ষেত্রেও। বলা হয়েছে, স্টপেজে গিয়ে বাসের জন্য কমপক্ষে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। আর যানজটে বাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় হয়। সময়ের মূল্য বিবেচনায় বিআরটি বা মেট্রোরেলের ভাড়া বেশি হলেও যাত্রীদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তবে আরএসটিপির ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, বাসে সাধারণত সীমিত আয়ের মানুষ যাতায়াত করে। তাই বাসের চেয়ে বিআরটির ভাড়া অনেক বেশি হলে তা কখনোই যাত্রী আকর্ষণ করবে না। একইভাবে অত্যধিক ভাড়া মেট্রোরেলের যাত্রী হ্রাস করবে। তাই সরকারের উচিত ভাড়া থেকে নির্মাণ ব্যয় বাদ দিয়ে শুধু পরিচালনা ব্যয় বিবেচনা করা।

সানবিডি/ঢাকা/আহো