জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জ্ঞানের প্রদীপ

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২৩ ১৯:৪৪:৫৯ || আপডেট: ২০১৬-০১-২৩ ১৯:৪৪:৫৯

JNU.sunbdবুড়িগঙ্গার তীরবর্তী পুরান ঢাকায় অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষ্ণচূূড়ায় আচ্ছাদিত এই বিদ্যাপীঠ শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরুর পিছনে রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। পাঠশালা থেকে  যাত্রা শুরু করে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদাচারণা। অনেকটা রহস্য জনক মনে হলেও বাস্তব। পাঠশালায় শিক্ষা দানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের একমাত্র বিদ্যাপীঠ এটি।

বুড়গিঙ্গা নদীর তীরর্বতী এই বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ছিল ব্রাহ্মদের স্কুল।১৮৫৮ সালে ব্রজসুন্দর মিত্র, অনাথ বন্ধু মল্লিক, দীননাথ সেন, পার্বতীচরন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম স্কুল সময়ের আবর্তনে স্ব বৈশিষ্ট্যে আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ।এ বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে সুধীমহলের কাছে সুপরিচিতি লাভ করে।

১৮৭২ সালে বালিয়াটির জমিদার কিশোরী লাল রায় এই বিদ্যাপীঠকে স্কুলে উন্নীত করে  তার পিতার (জগন্নাথ রায় চৌধরী) নামে এ বিদ্যাপীঠের নামকরণ করেন। এই স্কুলটি ১৮৮৪ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীর ও ১৯০৭-০৮ সালে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা লাভ করে সুধীমহলকে দৃষ্টি নন্দিত করে। শিক্ষার ধারাকে অব্যাহত রাখতে ১৮৮৭ সালে স্কুল ও কলেজ শাখাকে পৃথক করে  স্কুল শাখাকে কিশোরী লাল জুবলী স্কুল এবং কলেজ শাখাকে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ নামে নামকরণ করা হয়। এভাবে শিক্ষার প্রসার চলতে থাকে।

তবে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে জগন্নাথ কলেজকে অবনমন করা হয় এবং ‘জগন্নাথ কলেজ অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে  ‘জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ নামকরন করে এর স্নাতক পর্যায়ে পাঠদানের ক্ষমতা রহিত করা হয়। এ ধারা ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে জগন্নাথ কলেজ অবকাঠামো, ছাত্র-শিক্ষক এমনকি গ্রন্থাগারে বই প্রদান করলে এর মর্যাদা বহু গুনে বেড়ে যায়। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হওয়া স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর শ্রেনীর শিক্ষা কার্যক্রম আজও অব্যাহতভাবে চলছে।

২০০৫ সালে জাতীয় সংসদ পাশকৃত ২৮ নং আইন বলে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করলেও পূর্নাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় ২০১২ সালে ২৭/৪ ধারা নামক কালো আইন বাতিলের মধ্য দিয়ে। ৩১টি বিভাগ, একটি ইনস্টিটিউট, প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী, পাঁচ শতাধিক শিক্ষক ও তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আজ দশম বছরে পা রাখে।

শিক্ষার পাশাপাশি এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এ বিদ্যাপীঠ সিপাহ সালারের ভূমিকা রাখে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভাষা শহীদ রফিক উদ্দীন এ বিদ্যাপীঠের ছাত্র ছিলেন। এছাড়াও হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে এ বিদ্যাপীঠের সদস্যরা ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

এই বিদ্যাপীঠের ছাত্র ঢাকা মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন বীর বিক্রম খেতাব। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এ বিদ্যাপীঠের ছাত্র জাতীয় ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় ভোল্ট চ্যাম্পিয়ান মেরাজ উদ্দীন। এছাড়াও সাহিত্য-সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, খেলাধুলায় এমনকি নেতৃত্বে এ বিদ্যাপীঠের অবদান তুঙ্গে। সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, কথা শিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমেদ এমনকি ঢাকা মহানগর দক্ষিনের বর্তমান মেয়র আলহাজ্জ সাঈদ খোকন এরা সবাই এ বিদ্যাপীঠের ছাত্র ছিলেন।

সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারা অব্যাহত রাখতে এ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি রয়েছে একটি বাউল চত্তর। সেখানে বসে নিয়মিত গানের আসর। বিকাল নামতেই কেন্দ্রিয় খেলার মাঠ, শহীদ মিনার, কাঁঠালতলা, মিডিয়া চত্ত্বর, একাত্তরের গণহত্যা ভাস্কর্য চত্ত্বর, মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুতি ভাস্কর্য চত্ত্বর ও শান্ত চত্ত্বরে বসে আড্ডার আসর।

সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে সম্মুখে এগিয়ে চলা এ বিদ্যাপীঠের এতো সফলতার মাঝেও রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। একাডেমিকভাবে এগিয়ে গেলেও এ বিদ্যাপীঠেরে ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নেই কোন আবাসন ব্যবস্থা। এ বিদ্যাপীঠের ১২টি হলের একটি হলও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনে নেই। অধিকাংশ হলই ক্ষমতাশীল ঘাতক নেতাদের দখলে। নতুন হল নির্মাণে নেই কোন কর্মতৎপরতা। রয়েছে পর্যাপ্ত শ্রেনী কক্ষের অভাব। এছাড়াও ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কটি একাডেমিক ভবন। এত কিছুর সত্ত্বেও এ বিদ্যাপীঠ জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশ-বিদেশ। আজও আলোকিত মানুষ তৈরিতে বাংলার লাখো সন্তানের চেতনার বাতিঘর এ বিদ্যাপীঠ ।

সানবিডি/ঢাকা/রাআ