দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির টাকা জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের পেটে!!

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২৩ ২১:৩৯:৪৩ || আপডেট: ২০১৬-০১-২৩ ২১:৩৯:৪৩

norail_85299নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২৩ প্রকল্পের অধিকাংশ টাকা জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন ও শ্রমিকরা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি গত নভেম্বরের ২৮ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে। শেষ হবে আগামী ২০ জানুয়ারি।

২০১৫-১৬ অর্থ বছরের প্রথম পর্যায়ে ৪০ দিনের এ কর্মসূচিতে এ উপজেলায় ৯২৩ জন শ্রমিকের কাজ করার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১২টি ইউনিয়নে ২৩টি প্রকল্পের জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৭৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। শ্রমিকদের সকাল ৭টা থেকে ২টা পর্যন্ত কাজ করার কথা। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার শ্রমিকদের ছুটি থাকবে। প্রতি কর্মদিবসের জন্য শ্রমিকরা মজুরি পাবেন ২০০ টাকা করে। প্রকৃত দরিদ্ররা যাতে যথাযথভাবে এ টাকা পান সে জন্য ব্যাংকে হিসাব খুলে শ্রমিকদের নিজস্ব চেকের মাধ্যমে মজুরি পরিশোধের নিয়ম রয়েছে। প্রকল্পে মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশ নারী থাকার কথা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কর্মসূচিটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। গ্রামাঞ্চলে অতিদরিদ্রদের জীবনযাপনে সহায়তা ও আপৎকালীন কর্মসংস্থানের লক্ষে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটি শুরু হয়।

গত সোমবার থেকে রোববার পর্যন্ত উপজেলার ১১টি প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প বিবরণী সম্বলিত সাইনবোর্ড টানানোর কথা থাকলেও কোনো প্রকল্পে তা নেই। কোথাও সব শ্রমিক পাওয়া যায়নি। যৎসামান্য শ্রমিক দিয়ে অল্প কয়েকদিন কাজ হয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্পে নারী শ্রমিক ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউপি সদস্যরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে শ্রমিকদের পরিশোধ করেছেন। উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্প এলাকার স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, জনপ্রতিনিধিরা এবং সরকারি কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে ২৩ প্রকল্পের অধিকাংশ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অতিদরিদ্রদের এ টাকা আত্মসাৎ করা মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের পরিচয়। এসব লোকজন জানান, প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প বিবরণী সাইনবোর্ড থাকলে স্থানীয় লোকজনই কাজ আদায় করে নিতেন।

দিঘলিয়া ইউনিয়নের চরদিঘলিয়া পূর্বপাড় শওকত মোল্লার বাড়ি হতে দক্ষিণ দিকে চারের ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৩৪ জন শ্রমিকের মজুরির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। গত শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। গ্রামে ঘুরে ওই প্রকল্পে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। এদের মধ্যে আনোয়ার মোড়ল বলেন, ‘৪০ দিনির মধ্যি এহানে মোট ১২ দিন কাজ হইছে। ১২ দিনি ১৫ শ টাকা পাইছি। মেম্বার বলিছে কাজ শেষ হয়ে গেছে, আবার কাজ পাস হলি ডাকপানি।’

তিনি জানান, স্থানীয় ইউপি সদস্য অমল কৃষ্ণ ঘোষ এ কাজ করিয়েছেন এবং ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এনে দিয়েছেন। চেকে কোনো স্বাক্ষর নেননি। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু মীর জানান, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম তাকে জানিয়েছেন ইউপি সদস্য অমলকে এ কাজ চুক্তিতে দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন এখানে ৩৪ জনের জায়গায় একেকদিন ৭ থেকে ১৪ জন করে কাজ করেছেন। ওই ইউপি সদস্য নিজের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের দিয়ে ব্যাংকে হিসাব খুলে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রকৃত অতিদ্ররিদ্র শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়েছেন। এ ব্যপারে অমল কৃষ্ণ ঘোষ বলেন, ‘অন্য জায়গায় কাজ হচ্ছে।’ কোথায় কাজ হচ্ছে তা তিনি বলতে পারেননি। খোঁজ নিয়ে অন্য জায়াগায় কাজ হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি। তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিজে ব্যাংক থেকে টাকা তুলিনি, অন্য একজন টাকা তুলে দিয়েছেন।’

পারমল্লিকপুর পিকুলের বাড়ি হতে ব্রীজের পূর্বপাড় পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কার প্রকল্পে ৪৫ জন শ্রমিকের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে ওই রাস্তায় কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। সেখানে শুধু ব্রীজের দুই পাশে সামান্য মাটি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, মাত্র ৮-১০ দিন সর্বোচ্চ ১২ জন করে শ্রমিক এখানে কাজ করেছে।

দিঘলিয়া ইউনিয়নের নোয়াগ্রাম জাহাঙ্গীর মোল্লার বাড়ি হতে কুদ্দুস মুন্সীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কার প্রকল্পে ৬৫ জন শ্রমিকের জন্য ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এখানে গত শনিবার সকাল ১১টার সময় কোনো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ওই কাজে নিয়োজিত ছিলেন এমন কয়েকজন শ্রমিক জানান, প্রতিদিন ৮-১৩ জন শ্রমিক এখানে কাজ করেছে। স্থানীয় মেম্বার টাকা তুলে এনে দিয়েছেন। চেকে স্বাক্ষর নেয়নি।

অগ্রণী ব্যাংক লোহাগড়া বাজার শাখার ব্যবস্থাপক শেখ মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, আট কিস্তির মধ্যে ছয় কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি টাকা আগামী বৃহস্পতিবার পরিশোধ করা হবে। পিআইও মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক অবস্থানে থাকা কঠিন। তাহলে চেয়ার থাকবে না।’ লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘নতুন ইউএনও হয়েছি, তাই বুঝতে দেরি হয়েছে। এছাড়া ১৫ দিন প্রশিক্ষণে ভারতে ছিলাম। তাই সমস্যা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব বিষয়ে শক্ত অবস্থানে থাকব।

সানবিডি/ঢাকা/রাআ