বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক

আপডেট: ২০১৬-০১-২৮ ০৭:৫৫:১৪


116934_1[কিছু ডিসক্লেইমার্স-

ডিসক্লেইমার ১- লেখাটা সাধারন পর্যবেক্ষনের উপর বেইস করে। এর ব্যতিক্রম সমাজে অবশ্যই আছে।
ডিসক্লেইমার ২- এই লেখার সাথে আমার শ্বশুড়বাড়ির কোনো সম্পর্ক নেই।
ডিসক্লেইমার ৩- বউ’দের পার্স্পেক্টিভ থেকে এই লেখা। যখন শ্বাশুড়ি হবো, শ্বাশুড়িদের সার্কেলে মিশবো, শ্বাশুড়িদের সাথে আড্ডা দেয়ার সুযোগ হবে- যদি ততদিন বেঁচে থাকি ইনশাআল্লাহ্‌- তখন শ্বাশুড়িদের পার্স্পেক্টিভ থেকে লিখবো!

ধন্যবাদ]

আমি আমার দাদীকে কখনোই তেমন পছন্দ করিনি।
দাদীও জানেন আমি উনাকে পছন্দ করিনা।
তারপরও আমি তার নাতনী তো। আম্মু উনার কানে এখনো যখন ফোন ধরিয়ে দেয়, কানে ভাল করে শুনেন না, তারপরও ফোনটা কানে নিয়ে খাস চিটাইংগা ভাষায় বলেন “ও নাতী, আই তো হানত ন হুনি। তোর মেফুয়া দুওয়ো গম আছে না?” (আমি তো কানে শুনি না! তোর মেয়ে দুইটা ভাল আছে তো?)

দাদীকে দেখতে না পারার অনেক কারন আছে।
তবে এখন যখন কারনগুলো বার্ডস-আই-ভিউ থেকে এনালাইসিস করতে চেষ্টা করি, একটা কারন বাকী সবগুলো থেকে সামনে এসে দাঁড়ায়।
আম্মু যখনই কোনো মিটীং-এ যেতো বা কোনো কারনে বাসায় থাকতো না, তখন যদি আব্বু বাসায় রেস্ট নিতে আসতো, দাদী আব্বুম্মুর রুমে গিয়ে আব্বুকে আম্মুর নামে শুধু গুজুর গুজুর ফুশুর ফুশুর করতো!

farjana-mahbuba
ফারজানা মাহবুবা: সিডনি প্রবাসী লেখক

এখন বুঝি, দাদী যে এটা ইচ্ছা করে করতেন তা না। জন্ম থেকে দাদী দেখে আর শিখে এসেছেন এটাই বাংলাদেশী সমাজে পরিবারের ধাঁচ।
বউ যত ভালই হোক এমনকি ফেরেশতা হয়ে গেলেও বউ’র নামে ছেলের কান ভারী করতেই হবে। নাহলে ছেলে হাত ছাড়া হয়ে যাবে!
এটা এক ধরনের মাস-লেভেলের শ্বাশুড়িদের খুব কমন সাইকোলজি। যারা একটু ‘মডার্ণ’ শ্বাশুড়ি, তারা আমার দাদীর মত হয়তো সরাসরি করেন না। কিন্তু সেইম কাজটাই করেন, অনেক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, এমনভাবে যেন ছেলেও না বুঝে কীভাবে ছেলের কাছে তার বউকে তিনি ছোট করছেন!

দাদী আমাদের বাসায় আসতেন ছোট্ট একটা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে।
আর যখন বাড়ী ফিরে যেতেন তখন টেক্সিতে জিনিষপত্রের জায়গা হতো না। যে পরিচিত কাকার টেক্সিতে করে বাড়ী ফিরতেন, ঐ কাকা তাই দাদীকে নিতে এলে সবসময় বড় বড় লম্বা দড়ি নিয়ে আসতেন।
আম্মু দাদীকে যা যা দিয়ে দিতেন সব টেক্সিতে যাতাযাতি করে ঢুকিয়ে বাকী বিশাল বিশাল বস্তা টেক্সির উপরে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যেতে হতো।

আর আমি চরম বিরক্ত হতাম।
দাদী আম্মুর লাইফটাকে হেল করে রেখেছে। অথচ তারপরও আম্মু কেনো দাদীকে এত করে?!

যে সময়টার কথা বলছি তখন আমি/আমরা আব্বুকে জমের মত ভয় পাই।
আক্ষরিক অর্থেই বলছি।
আব্বু বাসায় থাকা মানে মাটিতে একটা পিন পরলে তার আওয়াজও শোনা যাবে এমন!

কিন্তু আমার গায়ে আমার দাদার রক্ত।
দাদা হক্ব বা ন্যায্য কথাটা বলতে পৃথিবীতে কাউকে বা কিছুকে ভয় পেতেন না।
আর আমি যদিও পৃথিবীর সবকিছুকে ভয় পাই, কিন্তু রেগে গেলে আমি দাদা হয়ে যাই। তখন ভয় বলে কোনো ফীলিংস-ই আমার মধ্যে কাজ করে না।

আম্মু কিছুটা সাধু-সন্নাসী টাইপ মানুষ হলেও, মানুষ তো!
একদিন দাদীর কী একটা ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে আম্মু আমাদের রুমে এসে কাঁদছিলো।
আম্মুর কান্না নতুন কিছু না।
কিন্তু তখন ঐ মুহুর্তে কী যে হলো, সোজা হেঁটে গিয়ে আব্বুম্মুর রুমে গিয়ে আব্বুর সামনে চিৎকার করে দাদীকে বললাম, ‘আপনি এই মুহুর্তে এখন আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যাবেন! যান! বেরিয়ে যান!’

পুরো বাসায় যেন বাজ পরেছিলো।
আমার দুঃসাহসে এমনকি আব্বু পর্যন্ত হতভম্ব। আব্বু বড় গলায় ডাক দিলেন “বুড়ী!”

আব্বুকে কখনো আমাদের গায়ে হাত দিতে হয়নি।
আব্বুর ডাকেই আমাদের শিশি হয়ে যেতো, এতটা ভয় পেতাম আব্বুকে।
কিন্তু সেদিন আমি আবার দাদা হয়ে গেছি।
আব্বুকে উলটা ধমক দিয়ে আরো গলা উঁচু করে বললাম, “আপনার আম্মু আপনার কাছে যেমন, আমার আম্মু আমার কাছে তেমন। সাবধান যদি আর কোনোদিন আপনার আম্মু আমার আম্মুর নামে আপনার কাছে গোপনে কিছু বলতে আসে! তখন আপনার আম্মুর একদিন কী আমার একদিন!”

জীবনে একবারই মনে হয় আব্বুকে আংগুল তুলে কথা বলেছি।
সেদিনই।

এবং অদ্ভুত ব্যপার।
আব্বু একটা কথাও না বলে ঠিক যেভাবে চশমাটা নাকের উপর একটু ঠেলা দিয়ে পা টা চেয়ারের উপর বটে নিয়ে পেপারটা টেবিলের উপর একটু দূরে ধরে মনযোগ দিয়ে পেপার পড়তেন, সেভাবে পেপার পড়তে লাগলেন।
যেন কিছুই হয়নি!

দাদী বুঝেছিলেন অবস্থা বেগতিক।
আস্তে করে সুরসুর করে আমাদের রুমে ফিরে খাটের উপর কোরান শরীফ খুলে পড়তে বসে গিয়েছিলেন।

এরপর কোনোদিন আমি বাসায় থাকা অবস্থায় অন্ততঃ দাদী আব্বুর রুমে গিয়ে গোপনে কথা বলতেন না।
তবে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঁনে।
তাই আমি বাসায় না থাকলে আবার যে লাউ সেই কদু!

আমি বিরক্ত হতাম আম্মুর উপর, আম্মু কেনো দাদীর এই বাজে অভ্যাস এলাউ করে!
আম্মু উত্তরে একবার একটা ঘটনা বলেছিলো।
আব্বুআম্মুর বিয়ের পর প্রথম যেদিন দাদী এই কাজ করেন, আম্মুর মন খারাপ হয়েছিলো খুব। আম্মু কাঁদছিলো।
তাই দেখে আব্বু নাকি শুধু একটা কথা বলেছিলেন, “তুমি ঢাকা ইউনিভার্সিটী থেকে এম এ পাশ। আর আমার মা অক্ষর-জ্ঞানহীন। মা’র কথায় বা কাজে তোমার মন খারাপ করা মানায় না।”

আমি ঘোৎ করে উঠেছিলাম, ‘এম এ পাশ করলেই কী দাদীর সব অন্যায় সহ্য করতে হবে তোমার?’
আম্মু সবসময় যা করে, আমাকে শান্ত করতে বলেছিলো ‘তোর দাদী তোর আব্বুর মা। এই কথাটা মনে রাখিস। আর যতক্ষন পর্যন্ত তোর আব্বু ঠিক আছে, তোর আব্বু বুঝতেছে, ততক্ষন পর্যন্ত তোর দাদী যদি সারাদিন বসেও তোর আব্বুর কাছে গুজুর গুজুর ফুশুর ফুশুর করে, ক্ষতি কী?’

আমি জানিনা কেনো,
আম্মু আমাকে যতই বুঝাক না কেনো, একটা পরিবারে কেউ দরজা ভেঁজিয়ে দিয়ে পরিবারের আরেকজনের সাথে গুজুর গুজুর ফুশুর ফুশুর করবে, বিষয়টা আমার কাছে চরম চরম চরম mean মনে হতো, খুব নীচু স্তরের কাজ মনে হতো।
এখনো হয়।

তবে আমার ধারনা ছিলো, যেহেতু আমার দাদী একজন কমপ্লিটলি ট্র্যাডিশনাল গ্রামের মানুষ, তাই হয়তো এই অভ্যাস।

কিন্তু বড় হয়ে যখন বিয়ে হলো, ফ্রেন্ডসদের বিয়ে হলো, বিবাহিত সার্কেলে মেশা শুরু করলাম, অনেক অনেক বিবাহিত পরিবার দেখার সুযোগ হলো, বাংলাদেশের মেয়েদের জীবনের উপর একাডেমিক পড়ালেখা শুরু করলাম, অসম্ভব রকম অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম- প্রচুর পরিবারেই এই চরম mean কাজটাই স্বাভাবিক প্র্যাকটিস!!

অনেক অনেকদিন পর পুরো বিষয়টা আবার আমাকে স্ট্রাইক করলো রিসেন্ট আরেকটা ঘটনায়।

একটা আপুর ছোট ছেলের মুসলমানির দাওয়াত খেতে গিয়েছি।
যে টেবিলে বসেছি সদ্য পরিচিত আরো কিছু ভাবী আপুও আছেন। তাদের কয়েকজনের হাজবেন্ডও বসা।
একজনের হাজবেন্ডের মোবাইল বেঁজে উঠলো। উনি মোবাইলটা কানে দিয়ে “ও, মা?” বলে উঠে চলে গেলেন।
ভাবলাম হয়তো পারিবারিক আলাপ আছে উনার মা’র সাথে তাই উঠে গেছেন।
কিন্তু তখনই উনার বউ খুব আস্তে করে বলে উঠলেন, ‘গার্লফ্রেন্ডের ফোন আসছে! দেখছেন?’

শুধু আমিই না, পাশে বসা আর যে ক’জন আছে তারাও খুব অবাক!
হাজবেন্ডের মা’কে কেনো উনি হাজবেন্ডের গার্লফ্রেন্ড বলছেন?!

আমাদের অবাক দৃষ্টি দেখেই হয়তো উনি এক্সপ্লেইন করলেন, ‘বুঝেন নি? গার্লফ্রেন্ডের ফোন এলে ছেলেরা যেমন একলা চলে যায় কথা বলতে, ওর মা’র ফোন এলে ও সেইম কাজটাই করে। তাই আমি ওর মা’কে ওর গার্লফ্রেন্ড বলি!’

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো যেন খুব ভাল জোক্স বলা হয়েছে একটা।

খালি আমার হাসি এলো না।
তারপরও জোড় করে হে হে করে হাসার ভান করলাম একটু।
হাসি এলো না, কারন যে কেউ ভাল করে ভদ্রমহিলার চেহারার দিকে তাকালে বুঝতে পারতো ভদ্রমহিলা কতটা তিক্ত হয়ে তার হাজবেন্ডের মা’কে হাজবেন্ডের গার্লফ্রেন্ড বলেন!

একবার একজন শ্বাশুড়িকে যিনি তার নিজের জামাই, ছেলে এবং মেয়েকে নিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে ‘পারিবারিক আলাপ সালাপ’ ‘শলাপরামর্শ’ করেন, লজিক দিতে শুনেছিলাম- পরিবারে এমন অনেক বিষয় থাকে যা বউদের সামনে আলাপ করা যায় না।

ভদ্রমহিলাকে আমি পালটা কিছুই বলিনি।
তবে মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ভেবেছিলাম অনেক কিছুই।

হ্যা, এটা ঠিক, বউ কখনো মেয়ে হয়না।
ঠিক যেমন শ্বাশুড়ি কখনো মা হয়না।
তবে বউ মেয়ে না হলেও মেয়ের ‘মত’।
ঠিক যেমন শ্বাশুড়ি আপন মা না হলেও মা’র ‘মত’।
তাই একটা মেয়ে যখন একটা পরিবারে বউ হয়ে আসে, শ্বাশুড়ির উচিত সেই মেয়েকে মেয়ের মত দেখতে চেষ্টা করা। ঠিক যেমনটা বউ’র উচিত শ্বাশুড়িকে মায়ের মত সম্মান করতে চেষ্টা করা।

এখন সিনারিওটা চিন্তা করুন-
ঘরে বউ আছে।
মেয়ে আছে।
ছেলে আছে।
মা যদি বউটাকে বাদ দিয়ে তার নিজের জামাই, ছেলে আর মেয়েকে রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়, সে বউ’র পক্ষে কখনোই, কখনোই, কখনোই কি সম্ভব ঐ শ্বাশুড়িকে এবং শ্বাশুড়ির পরিবারকে আপন করে নেয়া?!?!
কারন শ্বাশুড়ি তো বউকে চোখে আংগুল দিয়েই দেখিয়ে দিচ্ছেন, তুমি এই বাড়ির বাইরের মানুষ। আমাদের গোপন কথা আমার ছেলে আর মেয়ের সাথেই শুধু শেয়ার করতে পারবো, তোমার সাথে না। এবং এমন অনেক গোপন কথা আছে যা তোমার সামনে বলা সম্ভব না।

যদি ধরেও নেই যে, দরজা বন্ধ করে শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি ননদ-ভাসুর জামাই’র সাথে বউ’র দোষ নিয়ে কথা বলছে না, পরিবারের অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলছে, কিন্তু বউ’টার পার্সপেক্টিভ থেকে বুঝার চেষ্টা করুন- সে কী দেখছে?
দেখছে এই পরিবারে একটা অদৃশ্য বৃত্ত টানা আছে।
সেই বৃত্তের ভিতরে আছে তার জামাই, জামাই’র মা, জামাই’র বাবা, জামাই’র ভাই-বোন।
আর সে একলা দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃত্তের বাইরে!

আবার এই বউ’র কাছ থেকেই আশা করা হয় সে এই পরিবারকে শুধু আপনই করে নিবেনা, একদম আপনের মত সার্ভ করবে?!

একটা কথা বলি, অনেকের কাছে কথাটা একটু rude লাগতে পারে।

একটা ছেলে যখন বড় হয়ে যায়, তখন সেই ছেলে পুরো পৃথিবীতে একটা মেয়ের সাথেই শুধু দরজা বন্ধ করার রিলেশানশীপ রাখে। সে মেয়েটা তার বউ। যে মা তাকে জন্ম দিয়েছে, সে মা-ও তখন আর নিজের ছেলের সাথে দরজা বন্ধ করার রিলেশানশীপ রাখে না।

শুধু মুখে মুখে “তুমি তো আমার মেয়ের মতই” এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেই শুধু হয়না, কাজেও করে দেখাতে হয়।

ডিয়ার শ্বাশুড়িরা,
আপনারা যদি চান আপনার বউ আপনার পরিবারকে আপন করে নিক, সবার আগে আপনি তাকে আপন করে নিন। মনে রাখবেন, আপনার ছেলে এখন তার হাজবেন্ড। তার হাজবেন্ডকে নিয়ে আপনি দরজা বন্ধ করবেন না। এই দরজাটা শুধু বাইরেই বন্ধ হয়না, তখন তার মনে আপনার পরিবারের জন্যও দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আপনার ছেলের বউ যদি পৃথিবীর সবচে’ খারাপ মেয়েটাও হয়, আপনি কেনো নিজেকে নীচু করবেন। আপনি উঁচু থাকুন। আপনি তাকে বৃত্তের ভিতরে টেনে নিন। বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন না। বউ যত খারাপই হোক, আপনার ছেলের বউ-ই তো! সে তো আপনার পরিবারেরই একজন।

এই লেখকের লেখা নিয়মিত পড়তে চাইলে ফেসবুকে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন -facebook