নাসের ভাই, এ কোন ভার আপনি আমাদের দিয়ে অসময়ে চলে গেলেন?

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২৮ ২২:৫৭:২৪ || আপডেট: ২০১৬-০১-২৮ ২৩:০১:০৭

Naserআজ দুপুরে ছোট ভাইয়ের এস এম এস পেলাম তাঁর পুত্র সন্তান হয়েছে। আমাদের পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তানের আগমনের সংবাদে যখন খুশীতে সবাইকে জানাচ্ছি ঠিক সেই সময়েই আরেকটা ভয়াবহ দুসংবাদের এস এম এস পেলাম। নাসের ভাই মারা গেছেন।
স্তব্ধ হয়ে বসে পড়লাম। মাথার ভেতরে প্রথমে শুন্যতা এসে ভর করলো, এর পরে শুরু হল তীব্র মাথা ব্যথা। দেশে থাকলে আমার ছুটে যাওয়ার কথা রাজশাহীতে। হোটেলে পৌঁছে সটান শুয়ে পড়লাম। ঘুম এলনা। ঘুরে ফিরে তন্দ্রার মতো আচ্ছন্ন অবস্থায় নাসের ভাইকে ঘিরে নানা ঘটনা মনে পড়তে থাকলো।
আমরা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছি মাত্র সেই সময় নাসের ভাই এলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। জানলাম তিনি কবি মোহাম্মদ রফিকের ছোট ভাই। সেই সময় কবি রফিক এরশাদের কবিতা লেখার বাতিক নিয়ে দারুণ একটা কবিতা লিখে তরুণদের হার্ট থ্রব-
“সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই, বন থেকে দাতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই।“ 
নাসের ভাই তখনো বিয়ে করেননি, থাকেন জুবেরি হলে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন নাসের ভাই। মারাত্মক অ্যাজমা ছিল নাসের ভাইরের, প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু কি অফুরান জীবনী শক্তি নিয়ে আমাদের সাথে সাথে থাকতেন। সারাক্ষণ গায়ে ঘুসঘুসে জ্বর নিয়ে নাসের ভাই হাসিমুখে তরুণদের সাথে পাল্লা দিচ্ছেন। তখনই লক্ষ্য করেছি, নাসের ভাইয়ের চিন্তাটা ঠিক সিপিবির অন্যান্য নেতাদের মতো নয়। সিপিবি সম্পর্কে নানা হতাশা থাকলেও সিপিবিকে একটা বিপ্লবী দল হিসেবে তৈরি করার জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন।
ভারত প্রশ্নে সিপিবির রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিরোধী ছিলেন। ভারত প্রশ্নে সিপিবির বিপ্লবী পার্টি হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা দরকার বলে মনে করতেন। তিনিই প্রথম পঞ্চম কংগ্রেসে “ভারত প্রশ্নে সিপিবির প্রস্তাবিত লাইনের থিসিস” পেশ করেন। চালাকি করে সেই থিসিস কংগ্রেসে উপস্থাপন করতে দেয়া হয়নি। নাসের ভাই সেটা নিয়ে খুব ক্ষুব্ধ ছিলেন।
Pinaki Vatyacharja
ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য। চিকিৎসক, গবেষক, লেখক

নাসের ভাই একটা গল্প করেছিলেন। রীতি হিসেবে সিপিবির কংগ্রেসের দলিল সোভিয়েত পার্টিতে পাঠানো হতো। সেখান থেকে একটা সাদা কাগজে সোভিয়েত পার্টির মতামত টাইপ করে পাঠানো হতো। সেই কাগজটা কংগ্রেসের আগে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পড়ে শোনানো হতো।

মুক্তিযুদ্ধের পরে প্রথম পার্টি কংগ্রেস। পার্টির দলিল নিয়ে সোভিয়েত পার্টির মতামত এসেছে। সোভিয়েত পার্টি মুলত দুটো মতামত দিয়েছে।
১/ তোমরা দলিলে ১৭ বার লিখেছ “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”, তিনি জত মহান নেতাই হোন না কেন শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উনার মূল্যায়ন করবে, উনাকে নিয়ে এই উচ্ছ্বাস কমিউনিস্টদের মানায় না।
২/ ভারতের সাথে বন্ধুত্ব মুলক সম্পর্কের জন্য তোমাদের আগ্রহ কেন? সোভিয়েত রাষ্ট্র যা করবে সেটাকেই স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টিকে অনুসরন করতে হবে সেটার মানে নেই। ভারত সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়, কমিউনিস্ট সরকারও নেই, তাঁর সাথে বন্ধুত্ব দিয়ে কমিউনিস্টরা কী করবে?
যাই হোক, ঘটনা ঘটলো তার পরে। সোভিয়েত পার্টির মতামত সেই সম্যের সিপিবির কোন কোন কেন্দ্রীয় নেতার মাধ্যমে ইন্ডিয়ান এম্ব্যাসি হয়ে পৌছালো ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। এরপরে নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে ইন্দিরা গান্ধী ব্রেজনেভকে ফৌন দিয়ে সোভিয়েত পার্টির এই মতামতের ব্যাখ্যা চেয়েছিল। এরপরে সোভিয়েত পার্টি নিষেধ করে দিয়েছিল কোন দলিল যেন সিপিবি সোভিয়েত পার্টির কাছে না পাঠায়। সোভিয়েত পার্টি আরো সতর্ক করে দিয়েছিল যে, তোমাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এমন কেউ কেউ আছে যে সিপিবির চাইতে ভারতের প্রতি বেশী অনুগত।
নাসের ভাই একদিন বললেন, তুমি লক্ষ্য করেছ, এই কুস্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর এই অঞ্চলটার মধ্যেই বাঙলার সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক ইতিহাস ঘুরপাক খেয়েছে। যেমন ধর লালন, রবীন্দ্রনাথ, মীর মোশাররফ হোসেন, বঙ্গবন্ধু, জসিম উদ্দিন, কাঙ্গাল হরিনাথ, গগন হরকরা, কাজী মোতাহার হোসেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, হাজী শরিয়তুল্লাহ, সুনীল, মৃণাল সেন, তারেক মাসুদ, অমল বোস, মাইকেল মধুসুদন, ইলা মিত্র, ফররুখ আহমেদ, বাঘা যতীন। এই সব মাথা এক জায়গায় হল কীভাবে? ঘুরে ফিরে লালন কুস্টিয়াতেই বেড়ে উঠার জায়গা পেলেন। এমনকি কমিউনিস্ট আন্দোলনের মুল প্রভাব ছিল এই অঞ্চলেই। পরে সন্ত্রাসবাদী লাইন ধরে সব ধ্বংস হয়ে গেল। নাসের ভাই দৃঢ় ভাবেই মনে করতেন বাংলাদেশের পরিবর্তনের সুচনা এই অঞ্চল থেকেই হবে।
বাংলাদেশের চিন্তার জগত নিয়ে হতাশা ছিল নাসের ভাইয়ের। তিনি বলতেন রবীন্দ্রনাথের মতো একটা বিশাল প্রতিভার কারণে আমরা রবীন্দ্রনাথকে শুধু শিল্প সাহিত্যেও নয় চিন্তার জগতেও সর্বোচ্চ আসন দিয়ে ফেলেছি। তাই আমাদের চিন্তা সাহিত্য আক্রান্ত। চিন্তা যতদিন দর্শন আক্রান্ত না হবে ততদিন বাংলাদেশের মুক্তি নেই।
দুই মাস আগে নাসের ভাই ফৌন করে ডাকলেন উনার উত্তরা বাসায়, বললেন একটু আসো জরুরী আলাপ আছে। গিয়ে দেখলাম ভাবীও আছেন, বেশ সিরিয়াস ভাব নিয়ে দুজনেই অপেক্ষা করছেন। আমি একটু ঘাবড়ে যাই। নাসের ভাই শুরু করলেন, “পিনাকী তোমার রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা আর লেখালেখি করা উচিৎ; কমিউনিস্টদের রাষ্ট্র চিন্তা দুর্বল। কমিউনিস্টরা এই কারণেই সফল বিপ্লব করেও রাষ্ট্র টিকাতে পারেনা। তুমি চিন্তা শুরু করেছ, আরো একটু লেখাপড়া করে নিয়ে লেগে পর।“ এই হচ্ছে নাসের ভাইয়ের জরুরী আলাপ।
দেশের বাইরে আসার আগে নাসের ভাইকে ফৌন করবো ভেবেছিলাম, আমার প্রকাশিতব্য “ধর্ম ও নাস্তিকতাঃ বাঙালি কমিউনিস্টদের ভ্রান্তি পর্ব” বইটার ভুমিকা নাসের ভাই লিখে দিতে চেয়েছিলেন। কেন জানি ফৌন করাটা হয়ে ওঠেনি।
একে একে মাথার উপরে থেকে মহীরুহগুলো সরে যাচ্ছে; যেই সময়টায় নাসের ভাইয়ের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন ছিল সেই সময়েই তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন। চিন্তার আর তৎপরতার যেই পথাচলা শিখিয়েছিলেন নাসের ভাই, সেই পথ চলা যে এখনো অনেক বাকী, আমরা একা একা পারবো তো নাসের ভাই..