রাজ্জাকের পর এবার শিশির মনির লাপাত্তা

|| প্রকাশ: ২০১৬-০১-২৯ ১৯:২৫:১৬ || আপডেট: ২০১৬-০১-৩০ ১০:৪৬:৫১

munir_100229মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির আসামি দলের নেতাদেরকে ফেলে দেশ ছেড়ে আগেই চলে গেছেন জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাক। প্রধান আইনজীবী লাপাত্তা হওয়ার পর মামলা পরিচালনায় প্রধান উকিল হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেনকে দায়িত্ব দিতে হয়েছে জামায়াতকে। আর জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে নেতাদের মামলা দেখভাল করেছেন সাবেক শিবির নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিন নেতার দুই নেতার ফাঁসি ও আরও এক নেতাকে ফাঁসির মুখে ফেলে এবার দেশ ছেড়েছেন তিনিও।

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির দণ্ড পুনর্বিবেচনার আবেদন করার আগেই বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এই আইনজীবী। দলের বিশ্বস্ত একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জামায়াতের ওই সূত্রটি জানায়, গত ৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে নিজামীর আপিল শুনানির দুদিন পর দেশ ছাড়েন শিশির মনির। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন।

তবে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মারুফ হাসান সরদার। তিনি বলেন, ‘শিশির মনির কোথায় তা আমার জানা নেই’।

১৪ অক্টোবর মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের (ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে) পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন শিশির মনির।

গত বছরের ২২ অক্টোবর শিশির মনিরের মোহাম্মদপুরের বাসায় তল্লাশি করে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে তিনি তখন বাসায় ছিলেন না। সে সময় পুলিশ নিজামীর মামলার নথিপত্র নিয়ে যায়- এই অভিযোগে এই মানবতাবিরোধী অপরাধীর আপিল শুনানিতে এক দফা সময় নিয়েছেন আইনজীবীরা।

শিশির মনিরের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে, সে বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামালউদ্দিন মীর অবশ্য এখন কিছু বলতে পারছেন না। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না’।

২৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদালতে শিশিরের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করে জামায়াতের আইনজীবী দল।

আবেদনে শিশির মনির আদালতে উপস্থিত থেকে যেন নিজামী ও মুজাহিদের মামলা পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন হয়রানি না করা হয়- সে ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়।

কিন্তু আর আদালতে আসেননি শিশির মনির। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী সাইফুর রহমান বলেন, ‘ডিসেম্বরে শিশির বিদেশ চলে গেছেন। কবে দেশে ফিরবেন, তা অনিশ্চিত’।

দেশ ছেড়ে গেলেও এই আইনজীবী ফেসবুকে সক্রিয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আইন বিষয়ক উচ্চতর পড়াশোনা করবেন- বলছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।

রাজ্জাকের খোঁজ নেই

মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি ঠেকাতে আদালতে দৌঁড়ঝাঁপ কম করেননি দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাক। কিন্তু তার ফাঁসি কার্যকরের পাঁচদিন পর সেই যে দেশ ছেড়েছেন রাজ্জাক, আর ফেরেননি তিনি। তার বিদেশ যাত্রার পর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। ফাঁসি কার্যকর হয়েছে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মুজাহিদের। আপিল বিভাগে ফাঁসির রায় হয়েছে দলের আমির মতিউর রহমান নিজামীর।

নিজামীর দণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা জানা যাবে রায় পর্যালোচনার আবেদনের পর। আবেদন নাকচ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ পাবেন মুজাহিদ। তবে ট্রাইব্যুনালে তার মামলা নিয়ে লড়লেও আপিল আবেদনে একটি দিনের জন্যও দলের প্রধান আইনজীবীর সহযোগিতা পায়নি জামায়াত।

জামায়াতের অন্যতম নীতি নির্ধারক হলেও রাজনৈতিক ময়দানে দলীয় পরিচয়ে রাজ্জাককে কখনই অতটা সক্রিয় দেখা যায়নি। বরং দলের নেতাদের আইনি সহায়তায় কাজ করেছেন সব সময়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের রক্ষায় আইনি লড়াইয়ে তিনিই ছিলেন প্রধান আইনজীবী।

কিন্তু  নেতারা যখন ফাঁসির মুখে তখন আবদুর রাজ্জাক কেন লাপাত্তা, তার কোনো জবাব নেই জামায়াতের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের কাছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিব্রত হন তারা।

রাজ্জাকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশ ঘুরে এখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন এই জামায়াত নেতা। তিনি কবে ফিরবেন বা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে আদৌ ফিরবেন কি না তা নিশ্চিত নন জামায়াত নেতারা। পরিবারের আশঙ্কা, দেশে ফিরলে দলের অন্য শীর্ষ নেতাদের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হতে পারেন আবদুর রাজ্জাকও। এ জন্যই জামায়াতের কোনো কোনো নেতা তাকে বিদেশে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে তার পরিবার সূত্র।

জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী নেতা হিসেবে তার নাম কখনো সামনে আসেনি, যদিও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা তারও ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘রাজ্জাক সাহেবকে সরকারই দেশে আসতে দিচ্ছে না। কারণ তিনি যেদিনই বিদেশে গেছেন সেদিনই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। তাই তিনি বাধ্য  হয়েই বিদেশে অবস্থান করছেন’।

সানবিডি/ঢাকা/রাআ