সাম্প্রতিক দরপতনে সাধারন বিনিয়োগকারীরা কি করতে পারতো?

:: শফিকুল ইসলাম || প্রকাশ: ২০২১-১১-১৬ ১৫:৪০:১৪ || আপডেট: ২০২১-১১-১৬ ১৫:৪৩:১৩

বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের সাথে যারাই জড়িত আছেন তাঁরা সকলেই ভালভাবে অবহিত আছেন যে বিগত অক্টোবর মাসের ৩য় সপ্তাহ থেকে অদ্যাবধি মার্কেটে দরপতন ঘটে চলেছে, যদিও বিগত সর্বশেষ সপ্তাহের শেষ দু’দিন সূচক কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের ২য় সপ্তাহ সময়কালে মার্কেট সূচক দুই একদিন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ডিএসইএক্স ইন্ডেক্স বিগত ১০ অক্টোবর ২০২১ তারিখের ৭২৬৩ পয়েন্ট থেকে ৮ নভেম্বর তারিখে ৬৮০৩ পয়েন্টে নেমে যায়, যদিও পরবর্তী ২ দিন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ১০ নভেম্বর এ প্রায় ৬৯৯৬ এর কাছাকাছি দাঁড়ায়। শতকরা হিসাবে তা প্রায় ৩.৬৮% সূচকের হ্রাস, যা খুব বেশী নয়। কিন্ত অনেক শেয়ারের দাম ১০-১৫ পারসেন্ট পর্যন্ত কমে গেছে, যা সূচক পতন হারের চেয়ে অনেক বেশী। তার ফলে সাধারন বিনিয়োগকারীরা পথে না বসলেও অনেকেই যে ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। সে লোকসান তাঁরা আগামীতে পুষিয়ে নিতে পারবেন কিনা এবং পারলেও কতদিনে পারবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থার ফলে তাদের মধ্যে যে হতাশা সৃষ্টি হলো তাতে অনেকেই হয়তো চিরতরে এ মার্কেট ছেড়ে চলে যাবে। মার্কেটে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমে গেলে শেয়ার চাহিদাতেও ভাটা পড়ে যা মন্দা অবস্থা উত্তরণে বিঘ্ন ঘটায়। মার্কেটের সাম্প্রতিক এরুপ আচরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে সাধারন বিনিয়োগকারীরা কি করতে পারতেন বা কি সিদ্ধান্ত নেয়া যৌক্তিক ছিল সেটাই এ নিবন্ধের আলোচনার বিষয়।

আমরা যদি ডিএসইএক্স ইন্ডেক্স এর উইকলি (সাপ্তাহিক) প্রাইস চার্ট লক্ষ্য করি (২৬ জুলাই ২০২০ থেকে ১০ নভেম্বর ২০২১ পর্যন্ত) তাহলে দেখা যাবে যে জুলাই ২০২০ সন থেকেই প্রাইস বেড়েছে। তবে সে বৃদ্ধির গতি পেয়েছে এ বছরের এপ্রিল মাসের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত যখন ক্রমাগতভাবে তা নিরবিচ্ছিন্নভাবে বেড়েছে। সেরুপ বাড়ার শক্তি ছিল যথেষ্ট। তারপর সেপ্টেম্বর এর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মার্কেট দোদুল্যমানতায় ভূগছিল- উপরে উঠবে না নীচে নামবে সেটা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধ বিরাজ করছিল। ফলশ্রুতিতে সে সময়ে সার্বিক সূচক সামান্য বেড়েছিল, যদিও সে বৃদ্ধির হার পূর্বের সময়ের তুলনায় ছিল নগণ্য। সে অবস্থাকে মোটামুটি কনসোলিডেশন বা রেঞ্জ মার্কেট বলা যেতে পারে। চিত্রে সেই রেঞ্জ মার্কেট সময়টা বক্স এর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। যখন মাসখানেক ধরে এ অবস্থা চলছিল তখনই সতর্ক বিনিয়োগকারীর এলার্ট হয়ে যাওয়ার কথা। প্রাতিষ্টানিক ও স্মার্ট ট্রেডাররা সতর্ক হয়েছেন বলে ধরে নেয়া যায়। ঘন্টায় ১০০ মাইল বেগে চলা একটা মোটরগাড়ীকে চালক যখন গতি কমিয়ে তা ৪০-৫০ মাইলে নিয়ে আসেন বা আনতে বাধ্য হন তখন ধারনা করাই যায় যে সামনে বড় ধরনের কোন বাঁধা থাকতে পারে। হতে পারে সেটা সাময়িক-আবার হয়তো পুরোনো গতি ফিরে পেতে পারে, কিংবা গাড়ীটি একেবারেই থেমে যেতে পারে। সামনে কি আছে সে তথ্য পরিস্কার না থাকায় গাড়ীর গতি কিরুপ হবে তা ধারনা করা মুশকিল। তবে যিনি সচেতন ড্রাইভার তিনি প্রস্তত থাকবেন যে কোন অবস্থা মোকাবেলার জন্য – সেটাই স্বাভাবিক। সে অবস্থা শেয়ার মার্কেটের বেলায়ও প্রযোজ্য।

এখন আমরা আলোচনা করতে পারি যে যখন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রাইস বৃদ্ধির হার অনেকটাই থেমে গেল তখন সাধারন বিনিয়োগকারীরা কি সিদ্ধান্ত নিলে সম্ভাব্য বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারতেন। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য অপশনগুলো হতে পারতো নিম্নরুপঃ

(১) প্রাইস ট্রেন্ড এর গতি আরো পর্যবেক্ষণ করা এবং আপাতত এন্ট্রি দেয়া থেকে বিরত থাকা। যারা ইচিমুকো ক্লাউড নামক টেকনিক্যাল ইন্ডিকেটর দেখে থাকেন বা বুঝেন তাঁরা ভাল্ভাবেই জানেন যে কনসোলিডেশন বা রেঞ্জ মার্কেটে ট্রেডিং করতে এবং বিশেষতঃ নতুন করে এন্ট্রি দিতে হয় না। বরং অপেক্ষা করে প্রাইস ট্রেন্ড শেষ পর্যন্ত কোনদিকে যায় সেটা পর্যবেক্ষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

(২) স্টপ-লস কার্যকর করা। নিজের হোল্ডে থাকা শেয়ার ক্রয়কৃত দামের নীচে নির্ধারিত পরিমাণ লস মেনে নিয়ে এক্সিট করা, যাতে করে আগামীতে আরো পতনের ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়। তবে এ কাজটি বাংলাদেশের ট্রেডিং সিষ্টেমের বাস্তবতায় করা খুবই কঠিন। কারণ বিদেশের মত শেয়ার ক্রয়ের সময়ই স্টপ-লস প্রাইস ট্রেডিং সিষ্টেমে বসানোর সুযোগ এখানে নেই। ফলে ট্রেডারকেই প্রাইসের দিকে প্রতিনিয়ত খেয়াল রেখে দাম পড়ে যাওয়ার সময় কোন্ দামে উনি এক্সিট করবেন সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় এখানে জড়িত থাকার ফলে অধিকাংশের পক্ষে কাজটা করা যথেষ্ট কঠিন। তারপরও যিনি সে আবেগের উর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন শেষ পর্যন্ত তিনিই সফলকাম হয়ে থাকেন।

(৩) হাতে থাকা শেয়ারের একাংশ বিক্রি করে দেয়াঃ প্রাইসের ভবিষ্যত টেন্ড কি হয় তা অনিশ্চিত বিধায় হাতে থাকা শেয়ারের একাংশ অফলোড করে ফেলা। যদি পরবর্তীতে প্রাইস আরো পড়ে যায় তবে পতন মোটামুটি শেষ হওয়ার পরে পুর্বে বিক্রিত অর্থ দিয়ে কম দামে ঐ শেয়ার পুনরায় ক্রয়ের সুযোগ নেয়া যেতে পারে। এতে করে হাতে থাকা মোট শেয়ারের গড় প্রাইসিং কম হবে, যার ফলে মার্কেট সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেই ট্রেডারের পোর্টফলিও লাভে চলে আসবে। আর সব শেয়ার একসাথে বিক্রি করা ঠিক নয় এ কারণে যে রেঞ্জ অবস্থা শেষ হলে প্রাইসের উর্ধ্বগতি আবার শুরু হয়েও যেতে পারে- তখন যাতে অন্তত অর্ধেক পরিমাণ শেয়ারের উচ্চ দাম প্রাপ্তি থেকে লাভবান হওয়া যায়।

(৪) ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার এড়িয়ে চলাঃ বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের সাথে জড়িতদের সবাই অন্তত এ বাস্তবতা বুঝবার কথা যে মার্কেট যখন আপট্রেন্ড হয় তখন সাধারনভাবে অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়লেও সব কোম্পানীর দাম একই হারে বাড়ে না- বরং ফান্ডামেন্টালি ভাল কোম্পানীর দাম তুলনামূলকভাবে কম বাড়ে। আবার পতনমূখী মার্কেটে ফান্ডামেন্টালি স্ট্রং শেয়ারের দাম কম হারে পড়ে। তাই ডাউন্ট্রেন্ড মার্কেটে ট্রেড করতে হলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভাল কোম্পানীর শেয়ার কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ।

(৫) হাতে সবসময় কিছু অর্থ রাখাঃ কথায় আছে হাতের পাঁচ কখনো ছাড়তে হয় না। শেয়ার মার্কেটে এটা আরো বেশী সত্য। অথচ সাধারন বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই সেই ভুলটিই বেশী করে থাকেন। তাঁরা তাঁদের পুঁজির সবটুকু দিয়ে শেয়ার কিনে রাখেন। অনেকে আবার লোন নিয়ে মার্জিন একাউন্টের মাধ্যমে বেশী করে ট্রেড করেন। মার্কেট যখন ইতিমধ্যে চড়া হয়ে গেছে তারপরেই সাধারনত ক্ষুদ্র পুঁজির ট্রেডাররা উচ্চ দামে বেশি করে শেয়ার ক্রয় করেন- অতিরিক্ত লাভের বাসনা থেকেই তাঁরা এরুপ করে থাকেন। তাঁদের ধৈয্য ধারণ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে মার্কেট যখন পতন হয় বা নিদেনপক্ষে বড় ধরণের কারেকশন হয় তখন হাতে আর কোন অর্থ না থাকার কারণে কম দামে একই শেয়ার পুনরায় কেনার সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। এ উপদেশ আসলে সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। তবে বড় পুঁজির ট্রেডার বা প্রাতিষ্টানিক বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের ভূল সাধারনভাবে এড়িয়ে চলেন। সেরুপ ভুল সব সাধারন বিনিয়োগকারীরাই যে করেন এমনটি নয়- তবে অধিকাংশই যে তা করে থাকেন সেটা অন্তত অনুমান করা যায়।

উপরের চিত্র দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে কেউ যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শেয়ারের একাংশ বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ হাতে রেখে তা দিয়ে নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে আবার তা ক্রয় করে কিংবা হাতে রাখা পুঁজির একাংশ দিয়ে নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে শেয়ার ক্রয় করে থাকে তবে তাঁর সম্ভবত অনেক বেশী লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কেটের কারেকশন শেষ হয়েছে ধরে নিয়ে এরুপ প্রেডিকশন করা যায়। যদিও মার্কেটের বর্তমান যে অবস্থা তাতে নিশ্চিতভাবে বলাও যায় না যে সূচক আগামীতে উর্ধ্বমূখী হবেই। তবে সে অনিশ্চয়তা তো শেয়ার মার্কেটের সার্বক্ষনিক বৈশিষ্ট্য।

আশা করি এবারের মার্কেট কারেকশনজনিত করণীয় সম্পর্কিত ভুল থেকে সাধারন বিনিয়োগকারীরা শিক্ষা নিবেন এবং ভবিষ্যতে অনুরুপ ভুল করবেন না। তাতে করে কম পুঁজির ক্ষুদ্র শেয়ার ট্রেডার তথা বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে নিজে লাভবান হতে পারবেন এবং সেই সাথে দেশের শেয়ার মার্কেটের স্থিতিশীলতা অর্জনে ভূমিকা রাখবেন।

শফিকুল ইসলাম

Email: [email protected]

এএ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •