বিজয়ের ৫০ বছর

সান বিডি ডেস্ক আপডেট: ২০২১-১২-১৬ ০৯:১৬:৫৩


বিজয়ের ৫০ বছর পূর্ণ হলো আজ। দিনের নতুন প্রভাতে আজ তাই গোটা জাতি উৎসব-আনন্দে মেতে উঠেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীর ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে। অযুত-নিযুত প্রাণ মিলিত হয়েছে উচ্ছ্বাসে। উদ্বেলিত হয়েছে বর্ণিল উৎসবের ছটায়।

১৬ ডিসেম্বর আজ। বিজয় দিবস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পরিপূর্ণতায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের আজকের দিন দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর আগে এ বছরের ২৬ মার্চ জাতি পালন করেছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। সেই সঙ্গে পালিত হচ্ছে বাঙালির স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’, যার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তিও ঘটছে আজকের ঐতিহাসিক দিনটিতেই। বছরব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ নির্ধারিত থাকলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা না যাওয়ায় মুজিববর্ষের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুনর্নির্ধারণ করে সরকার।

বাঙালির মহান স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জনের ৫০ বছর পার হলেও আজও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর আস্ম্ফালন থেকে জাতি পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। মাত্র গত অক্টোবরে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজামণ্ডপ ও মন্দির-বাড়িঘরে এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির আরেক দফা ভয়াবহ তাণ্ডব দেখতে হয়েছে দেশবাসীকে। এর আগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের আন্দোলনের নামে সাম্প্রদায়িক নৈরাজ্যের কবলে পড়তে হয়েছিল দেশকে। আবারও এই অপশক্তির সহিংসতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও জাতিকে ভাবিয়ে তুলছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির দিনটিকে ঘিরে একদিকে আনন্দে ভাসবে দেশ, আরেকদিকে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর নানা অপতৎপরতা রুখে দাঁড়ানোর যূথবদ্ধ শপথে বলীয়ান হবে মানুষ। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় দেশকে উদ্ভাসিত করার দৃঢ় আহ্বানও উচ্চারিত হবে কোটি কণ্ঠে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বাণী

দেশবাসীকে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, “আসুন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরো বেশি অবদান রাখি, দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাই, গড়ে তুলি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’। মহান বিজয় দিবসে এই আমার প্রত্যাশা।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত ৫০ বছরে যা কিছু অর্জন, জাতির পিতা এবং তার দল আওয়ামী লীগের হাত ধরেই তা হয়েছে মন্তব্য করে তার মেয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের এই উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি হলো। আজ বাঙালি জাতির এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল দিন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাঙালি।

তিনি বলেন, বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আমি দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লাখ শহীদ, সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোন এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সেইসব দেশ ও ব্যক্তিদের প্রতি যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহায়তা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিভিন্ন বর্ণাঢ্য কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে জনসমাগম এড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব অনুষ্ঠান উদযাপন করা হচ্ছে।

শপথ নেবে জাতি

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘মহাবিজয়ের মহানায়ক’ প্রতিপাদ্যে আজ থেকে দু’দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। প্রথম দিনে আজ বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচালনায় থাকবে সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের শপথ। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

শপথ গ্রহণ শেষে আলোচনা পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। সম্মানীয় অতিথির বক্তব্য রাখবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আলোচনা পর্ব শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা সম্মানীয় অতিথিকে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধা স্মারক প্রদান করবেন।

এরপর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত দুটি স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীসহ দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হবে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বিজয় দিবসের কর্মসূচি

বিজয় দিবসের ৫০ বছর পূর্তির দিনে আজ সরকারি ছুটি। সূর্যোদয়ের সময় ঢাকার তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দর এলাকায় ৩১ বার তোপধ্বনি করে দিবসের অনুষ্ঠানমালার সূচনা করা হবে। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং সন্ধ্যায় আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন পতাকায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে।

সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা এ কুচকাওয়াজে অংশ নেবেন। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাককেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।

আওয়ামী লীগের দু’দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে- সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ৮টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতি ও ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিসৌধে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দলের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং আগামী শনিবার দুপুর আড়াইটায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত বিজয় শোভাযাত্রা।

বিএনপির কর্মসূচিতে রয়েছে- আজ ভোরে দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়গুলোতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন; সকাল সাড়ে ৭টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও পরে শেরেবাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাসাসের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ১৯ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালি এবং ২০ ডিসেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে আলোচনা সভা।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথকভাবে এ দিবসটি উদযাপনে বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।