ভোক্তা আন্দোলনকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে
আপডেট: ২০১৬-০৬-২০ ১০:৫২:০৬
যে কোন দেশেই ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষায় এবং সচেতনতা তৈরিতে শক্তিশালী ভোক্তা আন্দোলনের উপস্থিতি আবশ্যক । বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে সুশীল সমাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে কার্যকর ভোক্তা আন্দোলনের উপস্থিতি লক্ষণীয় । কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত এরকম সংগঠিত ভোক্তা আন্দোলন গড়ে উঠেনি, যার কারনে বাংলাদেশের ভোক্তারা জাতীয় এবং আন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত ভোক্তা অধিকার থেকে বঞ্ছিত।

ভোক্তা আন্দোলন তথা আন্তর্জাতিক ক্রেতা অধিকার দিবসের জন্ম খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মূল প্রবক্তা ছিলেন ওয়াশিংটন ভিত্তিক মাল্টিন্যাশনাল মনিটর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন সিনেটর র্যালফ ন্যাদের। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬০ সালে চারটি বিষয়ে মূলনীতি ঠিক করে ১৫ মার্চকে প্রতি বছর ক্রেতা অধিকার দিবস হিসেবে পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন মার্কিন কংগ্রেসে। বিশিষ্ট পরিবেশবাদী ও ভোক্তাদের অধিকার আন্দোলনের সোচ্চার কর্মী মালয়েশিয়ার আনোয়ার ফজল ভোক্তাদের মৌলিক অধিকার সম্বন্ধে সচেতনতার উদ্দেশ্য বৈশ্বিকভাবে এ দিবস উদযাপনের আহ্বান জানান। পরবর্তীকালে নেদারল্যান্ডের হেগ নগরীতে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এই পাঁচ দেশের ক্রেতা ভোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগঠন তথা “কনজুমার ইন্টারন্যাশনাল” গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংগঠন.-এর উদ্যোগে পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ক্রেতা-ভোক্তার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ভোক্তা সংগঠনের বিশ্বায়ন শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কনজুমার ইন্টারন্যাশনাল-এর অনুমোদিত বাংলাদেশের ক্রেতা-ভোক্তাদের অরাজনৈতিক জাতীয় প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের দীর্ঘ ৩৮ বছরের ভোক্তা আন্দোলনের সাফল্য খুব বেশি তা বলা যাবে না । এর কারন অবশ্য অনেক। ভোক্তা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসা সংগঠন “ক্যাব” শুরু থেকে আর্থিক অসচ্ছলতা, জনবল সংকট এবং কার্যকরী প্রচার প্রচারনা কৌশলের অভাবে ভুগছে । ২০০৯ সালে ভোক্তা সুরক্ষা আইন পাশ হবার পর প্রতিষ্ঠিত ভোক্তা সংরক্ষণ অদ্ধিদপ্তর এবং ভোক্তা পরিষদ তীব্র জনবল এবং পরিবহন সংকটে ভুগছে । এছাড়া সমন্বিত কোন ব্যাপক গনসচেতনতা মূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ ও দেখা যাচ্ছে না ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে একটি সফল সামাজিক আন্দোলনে যে সকল উপাদানের উপস্থিতি প্রয়োজন সে সকল উপাদানের উপস্থিতি ভোক্তা অধিকার আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে না । একটি সামাজিক আন্দোলন সফল হওয়ার জন্য দরকার কার্যকর ও দক্ষ নেতৃত্ব। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনে আমরা এখনও এরকম সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্ব দেখতে পাই না। আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে নিয়মিত আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অত্যাবশ্যক যা এখনও গড়ে উঠে নি। দেশের নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির জন্য যেরকম প্রচার প্রচারণার দরকার তাও আমরা দেখতে পাই না। দেশের সিংহভাগ ভোক্তা এখনও বিদ্যমান ভোক্তা অধিকার আইনে তাদের অধিকার এবং তাদের অভিযোগ করার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে অবহিত নন।
যদিও বিভিন্ন সমস্যার কারনে “ক্যাব” (CAB) পুরপুরি ভাবে ভোক্তা আন্দোলনকে সফল করতে পারেনি, তারপরও দেশের ভোক্তা আন্দোলনকে সফল করার জন্য মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে এই সংগঠনকে । কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ প্রজন্মকে এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে ।এর কারন অতীতে বেশিরভাগ সামাজিক আন্দোলনের মুল সূত্রপাত শুরু হয়েছিল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে । তরুণ প্রজন্ম জাতে নিজেরা ভোক্তা অধিকার নিয়ে জানতে পারে এবং তাদের আশেপাশের সবাইকে এই ব্যাপারে সচেতন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট অনেকে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় ভোক্তা অধিকার আইনের উপর জোড় দেন । তবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কিছু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম হয়ত দূর করা যাবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনের জন্য ব্যপক গনসচেতনতা এবং ভোক্তা সংগঠন কর্তৃক সরাসরি ভোক্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এমন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
উন্নত এবং উন্নয়নশীল অনেক দেশে বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ক্রেতা এবং ভোক্তাদের উপর জরিপ চালিয়ে “ভোক্তা সন্তুষ্টি সূচক” (Customer Satisfaction Index) তৈরি করা হয়। যদি সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন “ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান” এবং “শিল্পের” উপর “ভোক্তা সন্তুষ্টি সূচক” তৈরি করা যায় তাহলে ভোক্তার অধিকারের প্রতি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সমূহ আরও নজর দিতে বাধ্য হবে ।বাংলাদেশের ভোক্তা সংগঠকদের তাদের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন সমন্বিত কৌশল অবলম্বনের দিকে নজড় দিতে হবে । যেমন ঃ কোন পণ্যের দাম যদি অনৈতিক ভাবে বাড়ানো হয় তখন সে পণ্যের ক্রয় সম্মিলিত ভাবে বন্ধ করে দেওয়া এবং তার বিকল্প পণ্যের ব্যবহার শুরু করা । ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে নিয়োজিত সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবল এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার সরবরাহ নিশ্চিত করা । মিডিয়াকে ভোক্তার অধিকার আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে । প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক এবং অনলাইন মিডিয়াতে কোন কোন ক্ষেত্রে ভোক্তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তা প্রচার করতে হবে এবং সেই সাথে ভোক্তাদের তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন করতে হবে ।
লেখকঃ মাহামুদুল হাসান, প্রভাষক, মার্কেটিং বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বি.ইউ.বি.টি)






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














