আল্লাহ মাফ করুক সবাইকে…
প্রকাশ: ২০১৬-০৩-০৬ ১৮:১৮:২২
সারলিন বলে, মা আমি তো বাঁচব না, আমাকে মাফ করে দিও। আমি বলি, বাবা তুই বাঁচিস, আমি মইরা যাই।’ এটি কোনো নাটক বা সিনেমার সংলাপ না। নিজের শরীরে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, মা তার অগ্নিদগ্ধ কিশোর ছেলেকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত এ সান্ত্বনা কাজে আসেনি।
ছেলে আগেই চলে গেছে না ফেরার দেশে। সঙ্গে তার আরেক ভাই জারান (১৪ মাস) ও বা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের প্রকৌশলী শাহনেওয়াজকে (৫০) নিয়ে। এবার মাও চলে গেলেন। ১০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে রোববার হার মানলেন সুমাইয়া আকতার (৩৫)। এই মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে গেল একটি পরিবার, এক স্বপ্ন।
চার জনের মৃত্যুর পর বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য কিশোর জারিফকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে আগুনের এই লেলিহান শিখা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়ির সপ্তম তলায় রান্নাঘরে গ্যাসলাইন বিস্ফোরিত হয়।
এতে শাহনেওয়াজ ও তার স্ত্রী সুমাইয়া, তিন ছেলে সারলিন, জারিফ ও জারান দগ্ধ হয়। আগুনে শাহনেওয়াজের শরীরের ৯৫ শতাংশ, সুমাইয়া আকতার ৯০ শতাংশ, সারলিনের ৮৮ শতাংশ, জারিফের ৬ শতাংশ এবং জারানের ৭৪ শতাংশ পুড়ে যায়।
সংকটাপন্ন অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে গেলে ওইদিন বিকালে সারলিন এবং সন্ধ্যায় জায়ান মারা যায়। পরদিন শনিবার বাবা শাহনেওয়াজ মারা যান। মারা যাওয়ার আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুমাইয়া ইট-কাঠের এই নগরবাসীর বিবেককে দিয়ে গেছেন এক ধাক্কা।
তার আপন বড় ভাই নওশাদ জামান বোনের মুখে ঘটনার দিনের বর্ণনা রেকর্ড করে পরে পোস্ট করেন ফেসবুকে। সেখানে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘চিৎকার দিয়ে নামতেছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান, বাঁচান। গায়ে তো আগুন। তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। সাত তলা থেকে নামছি। তিন তলার লোকেরা একটা তোষক দিয়ে যদি জড়ায়া ধরতো।
একটা তোষক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো।’ তিনি বলেন, ‘বাসার চুলায় গ্যাসের পাওয়ার কম ছিল। বাসায় উঠলাম সিলিন্ডার গ্যাস ছিল না। তিনদিন কিনে খেয়েছি খাবার। তারপর মিস্ত্রি এসে রাইজার বাড়িয়ে পাওয়ার ঠিক করে দিচ্ছে । তারপরও গ্যাস লিক করতো।
গ্যাসের গন্ধ পাইছি। জানালা খোলা রাখতাম।’ সুমাইয়া বলেন, গ্যাসের গন্ধ পেয়ে রাতেও তার স্বামী মোমবাতি জ্বালিয়ে চেক করেছেন। পরে বললো- মনে হয় ওপরে ছাদ থেকে আসতেছে। তিনি বলেন, ‘চুলা অল্প জ্বালিয়ে চায়ের পানি দিছি। ওর আব্বু বললো ঘরে গ্যাসের গন্ধ আসছে, ফ্যানটা ছেড়ে দেই। ফ্যান ছেড়ে জানালা খুলে দেয়ার জন্যে। জায়ান ওর বাবার কোলে। যেই ফ্যানটা ছেড়ে দেবার পরে দাউ দাউ করে আগুন।
সেকেন্ডের মধ্যে, এতো আগুন। আসলে ডাইনিং রুমটাই গ্যাস ভরা ছিল। শারলিনের রুম ছিল রান্না ঘরের পাশেই। একটা জানালা সম্ভবত বন্ধ ছিল।’ এরপর ঘটনার বর্ণনা দেন সুমাইয়া। বলেন, ‘আমি আর সারলিনের আব্বু নামছি। আগুন জ্বলতেছে গায়ে। চিৎকার দিয়ে নামতেছি- আগুন লাগছে সাহায্য করেন। বাঁচান, বাঁচান।
তিন আর চার নম্বর ফ্লোর থেকে দরজা খুলছে। আমাদের দেখে দরজা বন্ধ করে দিছে। একটা তোষক দিয়ে যদি জড়ায়া ধরতো। একটা তোষক না হয় পুড়তো। আমার বাচ্চাগুলো তো বাঁচতো। কত মানুষ সব তাকায়া আছে। কেউ আগায় না।’ তিনি জানান, ‘পরে নিচে নেমে, কাপড় তো পুড়ে গেল। নিচে ছিল ছালার চট।
টাইনা গায়ে দিছি। কত মানুষ, সবাই তাকায়া আছে, কেউ আগায় না।’ সুমাইয়া বলেন, ‘বলছি আমি মহিলা একটা চাদর দেন। কেউ দেয় না। বিল্ডিং এর মহিলারা কেউ দেয় না… আল্লাহ মাফ করুক সবাইকে।’ তিনি বলেন, ‘পরে নিচে নেমে চিৎকার দিয়ে দারোয়ানকে বললাম- আমার দুই ছেলে ওপরে আটকা পড়ছে, আপনারা তাড়াতাড়ি যান।
তারা যেতে যেতে শারীরন পুড়ে গেছে।’ সুমাইয়া বলেন, ‘সারলিন পুড়েছে বেশি, গায়ে পা থকথক হয়ে গেছে। সারলিন বলে, আমি তো বাঁচব না। আমাকে মাফ করে দিও আম্মু। আমি বলি, বাবা তুই বাঁচিস, আমি মইরা যাই। মানুষ এ রকম হয়। একি খারাপ না? কেউ কাউরে একটু সাহায্য করে না। এটা কি কথা?’
সানবিডি/ঢাকা/এসএস






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














