নারীর মুক্তি নারীর হাতেই

প্রকাশ: ২০১৬-০৩-১০ ১৮:২২:২৯


Azadআমাদের প্রিয় বাংলাদেশের বয়স ৪৫। এই ৪৫ বছরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আত্মনির্ভরশীল। খাদ্য উৎপাদনে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, প্রযুক্তির ব্যবহারে, খেলাধুলায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক দেশের জন্যেই রোল মডেল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অনেক ক্ষেত্রেই  নিজেরাই যে স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারে তা করেও দেখিয়েছে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের এতসব তাক লাগানো কাজের সাথে যুক্ত হয়েছে বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের মতই নারীর এগিয়ে চলার মধ্য দিয়ে।  এবং এগিয়ে চলাটাই যুক্তিসঙ্গত কারণ আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করবে’।

বর্তমানে আমাদের দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, রয়েছেন নারী স্পিকার। আমাদের আছেন সুযোগ্য বেশ কয়েকজন নারী প্রতিমন্ত্রী এবং এমপি । আমাদের উচ্চ ও নিম্ন আদালতে আসীন আছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক  নারী বিচারক।  বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আছেন নারী সচিব। দিন দিন বাড়ছে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা। আমাদের দেশের নারীরা পুলিশ, সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘের শান্তিবাহিনীর মত চ্যালেঞ্জিং কাজে উচ্চ পদে দক্ষতার সাথে কাজ করবে তা কেউ কি কখনও ভাবতে পেরেছে? কিন্তু আজ তা ধ্রুবতারার মত সত্য। গতানুগতিক ভাবে শিক্ষকতায়, ডাক্তারি পেশায় ও মিডিয়া লাইনে নারীর আধিপত্য ও দাপটতো আছেই। আমাদের উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ ও বিজয় রীতিমত চোখে পরার মত।

তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে বাংলাদেশের মত  মধ্যম আয়ের দেশে নারীর এতটা অগ্রসর হবার কারণ কি? অন্যতম কারণ বলতে গেলে প্রথমেই আসবে নারীর প্রতি আমাদের রাষ্ট্রের সমর্থনের কথা। রাষ্ট্র চেয়েছে বলেই আমাদের শহুরে শিক্ষিত নারীরা (একটা অংশ) একটি ভাল অবস্থানে আসতে  পেরেছেন । আমাদের সরকার নারীর আর্থসামাজিক অবস্থানকে মজবুত করার জন্য ইতিমধ্যেই নারী উন্নয়নমালা নীতি গ্রহণ করেছেন। চাকুরিজীবী নারীদের ৬ মাসের ম্যার্টানিটি লিভ দিয়েছেন। সন্তানের পরিচয়ে ক্ষেত্রে বাবার পাশে মায়ের নামটিও সংযুক্ত করেছেন।

বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠলেও আমাদের পার্লামেন্ট ও সরকারি চাকুরিতে নারীর জন্যে সংরক্ষিত আসন-কোটা  সংখ্যা বৃদ্ধি এক অর্থে নারীকে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে আগ্রহীই করেছে।

শহুরে নারীদের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীর অবস্থানের দিকে যদি তাকাই তাহলে সেখানেও দেখব নারীদের প্রতি বর্তমান সরকার বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্রামীণ নারীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান মজবুত করার জন্য বিভিন্ন রকম ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া হচ্ছে। তাদের জীবন যাপনের মানোন্নয়ন এবং কর্মে সম্পৃক্ত করার জন্যে  গ্রামে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প নেয়া হয়েছে।  তৃণমূল পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের হস্তশিল্পের বিকাশের জন্যে সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

গ্রামীণ নারীদের যখন সহায়তা দেয়া হয় দেখা যায় তারা তাদের প্রদেয় সহায়তা কখনই নয় ছয়  করেন না। সহায়তাকে পুরোপুরি ব্যবহার করে পরিবারকে তারা দিচ্ছেন আর্থিক স্বচ্ছলতা। নারীর হাতে যখন অর্থ তখন তার দরিদ্র পরিবার জানে তাদের দুঃখের দিনগুলোর পরিসমাপ্তি হয়ত সামনেই। নারী কি গায়েগতরে খেটে শুধু উপার্জনই করে যাবে? তার শরীর চলার মত শক্তিটা আসবে কোথা থেকে? তাই গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাদের পায়ের তলার মাটিকেই সরকার শুধু মজবুতই করছে না তাদের স্বাস্থ্যের দিকেও সরকারের রয়েছে দৃষ্টি। যার ফলে আজ গ্রামীণ নারীর সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। আজ মাতৃমৃত্যু হ্রাসে আমাদের দেশ অনেকখানিই সফল হয়েছে।

নারীর যে তার পায়ের তলায় সুদৃঢ় ভিত্তি  তৈরি করতে পেরেছে তার পিছনের রয়েছে ‘নারীর  শিক্ষা’। এখন আমাদের দেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত  ছাত্রীরা বিনামূল্যে অধ্যয়ন করছে । প্রবেশিকা পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এর ফলাফলের দিকে যদি তাকাই তবে ভাল ফলধারী হিসেবে দেখা যাবে নারীই এগিয়ে আছে। শুধু শহরে নয় গ্রামেও যে মেয়েটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে তার মধ্যেও কি ব্যক্তিসচেতনতা গড়ে উঠছে না? আর তার ব্যক্তিসচেতনতা সঞ্চারিত হচ্ছে তার মা খালাদের মধ্যে।

আর আমাদের গোল্ডেন গার্লরা যে আমাদের শক্তি। গোল্ডেন গার্ল তথা আমাদের গার্মেন্ট কন্যারা তো আমাদের অর্থনীতির প্রাথমিক জ্বালানি। তারা না থাকলে, তাদের অবিরাম পরিশ্রম না থাকলে দেশের সুবিধাভোগীরা কি পারতো এত আয়েশী জীবন উপভোগ করতে?

আমাদের দেশে নারীর সুরক্ষার জন্যে সাম্প্রতিক সময়ে হয়েছে নানা আইন। প্রিভেনশন অ্যান্ড রেসট্রেইন অব হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যাক্ট, পর্নোগ্রাফি কন্ট্রোল আইন, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ইত্যাদি। নির্যাতিতা নারীর আইনগত সুবিধা, অভিযোগ নেওয়ার জন্যে দেশের  প্রতিটি জেলায় খোলা হয়েছে  ‘স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ’। ধর্ষিতা নারীকে হেল্প করার জন্যে কয়েকটি সরকারি হসপিটালে ডিএনএ  ল্যাব খোলা হয়েছে।

অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, আইনগতভাবে, আর্থিকভাবে, মানসিক সাপোর্টে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রেকে সঙ্গে পাচ্ছে । সেই সাথে নারীর অগ্রগতির পথে পাশে রয়েছে তার পরিবার।

কিন্তু যখন রাষ্ট্র ও পরিবার থেকে নারীর প্রতি সর্বাত্মক সাপোর্ট থাকার পরও পত্রিকার পাতায় প্রায়শই পাই নারীর ( উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত) প্রতি ভয়াবহ পারিবারিক নির্যাতনের চিত্র।  তখন তাকে কি বলব ? আজও কেন তবে শুনি সন্তান না হবার বা পুত্র সন্তান জন্ম না হওয়ার জন্য কেবল নারী দায়ী? কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে  নারী প্রায়ই উচ্চশিক্ষিত পুরুষের নানা বিকৃতির শিকার। যদিও এর জন্য দায়ী হয় নারীর পোশাক বা তার স্মার্টনেস। প্রত্যন্ত গ্রামে গরীব অসহায় মেয়েরা যেমন বাল্যবিবাহের শিকার তেমনি শহরের অনেক নারী পড়াশোনা করে ( অনেক সময় ভাল ফলও করে) কেবলই ধনবান স্বামীর খোঁজে। সংসার আর সন্তানের খেয়ালের জন্যে কর্মক্ষেত্রের লোভনীয় অফার ছেড়ে দেয়াতো নারীর জন্য ডালভাত। কষ্টের পড়াশোনা চুলায় যাক সন্তানকে তো মানুষ করতে হবে। সন্তানের মানুষ না হবার দোষ তো তার কাধেই বর্তাবে শেষমেষ ।

কেন আমাদের নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে কম মজুরি পায়? আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি গার্মেন্ট কন্যাদের দিনরাত খাটুনির ফল কি তবে তাদের নানা রকম অপর্মত্যু ? আমাদের দেশে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত  কয়টি পরিবারের পুরুষ  নারীকে  বাড়ির পাশেই থাকা  হেলথ সেন্টারে নিয়েছে? এত আইনের পরেও কয়জন নারী তার ন্যায্য অধিকার, নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য আইনের আশ্রয় নেয়? নারীর শারীরিক ভালমন্দই  যখন  পরিবারে তেমন মূল্যায়িত হয়নি তাহলে  নারীর মনের অবস্থা জানার খোঁজ আদৌ কেউ রাখে কি ?

কয়জন নারীর আছে পরিবার, কর্মক্ষেত্রে নিজে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা? নারী যখন কর্মক্ষেত্রে তড়তড়িয়ে উঠতে থাকে তখন তার গুণ নয় রুপের কথাই সবার মুখে খই ফোটায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারী সে যে বড় অসহায়। সমাজ সংসারের ভয়ে উচ্চশিক্ষিত নারীও স্বামী কর্তৃক ‘চক্ষু উৎপাটন’ করার আগ পর্যন্ত মুখ বুজে করে চলে সংসার ।

তবে কি নারীর প্রতি সহিংসতার এসব খন্ডচিত্র আমাদের বর্তমানে নারীর বহুক্ষেত্রে ঘটা বিপ্লবের মুখে পানি ঢেলে দেবে? আর কতটা বছর  নারীর এতসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা নিয়ে  আমরা আন্তজাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে সেমিনার করে যাব (বিদেশেও আমাদের মত একই বিষয় নিয়ে চলে সেমিনার)? জানি না, আর কয়টি নারী দিবস আসলে আমাদের গ্রাম থেকে শহরের সব নারী হাজারও রকম কষ্ট  থেকে মুক্তি পাবে?

আমাদের নারীদের তবে কি আত্মমর্যাদা থাকতে নেই ? থাকতে নেই কোন অ্যাম্বিশন? আর কতকাল আমরা সবার সাথে মানিয়ে চলব ? ২০১৬ সালে মা-কন্যা-নারী নয়, মানুষ হিসেবে আমরা সবরকম নিপীড়ণ থেকে মুক্তি চাই। কার কাছে হাত পাতব আমরা এ মুক্তির জন্যে? জানি কেউ মুক্তির ডালা সাজিয়ে আমাদের জন্যে বসে নেই ।

আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ আর ঘরে বাইরে আমাদের প্রতি ধূলার সমান পরিমান নির্যাতনেও যদি আমরা নিজেরাই রুখে  দাঁড়াই তবেই মিলবে নারীর মুক্তি ।

ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা ।
তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ।।
তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে,
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে,
তোমার ওই শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা ।।
ওগো মা, তোমার কোলে জনম আমার, মরণ তোমার বুকে ।
তোমার ‘পরেই খেলা আমার দুঃখে সুখে ।
তুমি অন্ন মুখে তুলে দিলে,
তুমি শীতল জলে জুড়াইলে,
তুমি যে সকল-সহা সকল-বহা মাতার মাতা ।।
ওমা, অনেক তোমার খেয়েছি গো, অনেক নিয়েছি মা-
তবু জানি নে-যে কী বা তোমায় দিয়েছি মা !
আমার জনম গেল বৃথা কাজে,
আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে-
তুমি বৃথা আমায় শক্তি দিলে শক্তিদাতা ।। সূত্র: বাংলামেইল

লেখক: মৌলি অাজাদ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে সিনিয়র সহকারি সচিব