চাকরির আশায় বসে না থেকে ষ্ট্রবেরী চাষ করেই ভাগ্যের চাকা বদলেছেন নওগাঁর মাহবুব!
প্রকাশ: ২০১৬-০৩-১৮ ২০:৪৭:১১
লেখাপড়া করে দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে ষ্ট্রবেরী চাষ করে ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছেন নওগাঁর মাহবুবুর রহমান হাফিজ। ষ্ট্র্রবেরীতে সফল হওয়ায় আগামীতে ড্রাগন, আঙ্গুর ও পেয়ারা চাষের পরিকল্পনা নিতে চলছেন।
মাহবুবুর রহমান হাফিজ নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার গোপালকৃষ্ণপুর গ্রামে জন্ম গ্রহনকারী এবং বর্তমানে জেলা শহরের কোমাইগাড়ী মহল্লায় বসবাসরত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ মঈনুদ্দীনের ছেলে। মাহবুবুর রহমান ১৯৮৪ সালে হাফেজিয়া মাদ্রসা থেকে ৩০ পারার হাফেজ হয়ে বের হন, ১৯৯৮ সালে বগুড়া জামিল মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাশ করে কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ষ্টাডিজে ভর্তি হয়ে ২০০২ সালে মাষ্টার্স পাশ করেন। পড়াশুনা শেষ করে বেসরকারী ফুড বেভারেজে চাকুরী শুরু করলে পরিবারের কারণে চাকুরীটা ছেড়ে দিয়ে আসতে হয়েছে বাড়ীতে। চাকুরী না করে কিভাবে টাকা উপার্জন করে নিজের পায়ে দাড়ানো যায় সেই নিয়ে চিন্তা করতে করতে ষ্ট্রবেরী চাষের উদ্যোগ নেন তিনি।
২০০৮ সালে নওগাঁ শহরের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সামনে নিজস্ব ৫ কাঠা জমিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ড. অধ্যাপক মঞ্জুর হোসেনের আবিস্কারকৃত ষ্ট্রবেরী চাষ শুরু করেন। বেশ ভাল ফলাফল পান তিনি। সে সময় প্রতি কেজি ষ্ট্রবেরি ৫শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। বেশি ভাগ ষ্ট্রবেরিই বিক্রয় হতো চট্টগ্রামে। ভালো লাভ হওয়ায় ষ্ট্রবেরি চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি করার চিন্তাা ভাবনা নেন।
২০০৯ সালে ৩ বিঘা জমি লীজ নিয়ে ব্যাণিজ্যিক ভাবে ষ্ট্রবেরী চাষ করলে ওই বছর খরচ বাদ দিয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা আয় হয়। এরপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
২০১০ ও ২০১১ সালে ৩ বিঘা জমিতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা আয় করেন তিনি। ২০১২ সালে ৫ বিঘা জমি লীজ নিয়ে চাষ শুরু করলে সেবছর আবহাওয়া জনিত ক্ষতির কারণে ভাল করতে পারেনি। তারপরেও অব্যাহত থাকে তার প্রাণান্ত চেষ্টা। ২০১৩ সালে ৩ বিঘা জমি লীজ নিয়ে সে বছরে প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় করেন। ২০১৪ সালে ৫ বিঘা জমিতে প্রায় ৭ লাখ টাকা আয় করেন সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে। ২০১৫ সালে ৫ বিঘা জমিতে ষ্ট্রবেরী চাষ করলে খুব ভাল হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার আর হরতাল অবরোধ অসহযোগের কারণে সময়মত ঢাকা, চিটাগাং পৌঁছাতে না পারার কারণে খুব বেশী টাকা মুনাফা অর্জন করতে পারেননি। তারপরেও সে সময় লক্ষাধিক টাকা লাভ পেয়েছেন।
মাহবুবুর রহমান হাফিজ জানান, ষ্ট্রবেরি প্রতি বছর নভেম্বর মাসের দিকে লাগাতে হয়। এক বিঘা জমিতে ৫০ হাজার চারা লাগানো যায়। ষ্ট্রবেরি চাষের জন্যে এক বিঘা জমি তৈরী, সার, শ্রমের দাম, চারা, লীজকৃত জমির মূল্যসহ অন্যান্যে খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ২৫/৩০ হাজার টাকা। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ষ্ট্রবেরি তোলা শুরু হয়। প্রথমে মাত্র এক-দুই কেজি ষ্ট্রবেরি উৎপাদন হলেও দেড় হাজার টাকায় বাজারে পাইকারি বিক্রি হয়। দিন যায় উৎপাদন বেশি হয়, দামও কমা শুরু হয়। স্ট্রবেরির উৎপাদনের ভরা মৌসুমে এক বিঘা জমি থেকে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ কেজি সংগ্রহ করা যায়। আর বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ২শ’ কেজি টাকা দরে। তার ষ্ট্রবেরির বাগানে জাপানি এবং হাইব্রিড জাতের দুই ধরনের ষ্ট্রবেরি চাষ করা হয়। জাপানি ষ্ট্রবেরির স্বাদ ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি দামও বেশি।
চলতি মৌসুমে সদর উপজেলার শালুকা মৌজায় ৫ বিঘা জমি ৪৫ হাজার টাকায় বাৎসরিক লীজ নিয়ে ষ্ট্রবেরী চাষ করেছেন তিনি। গত দুই সপ্তাহ ধরে ষ্ট্রবেরী বিক্রি করতে শুরু করেছেন। শুরুতে দাম প্রতিমণ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পেলেও বর্তমানে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। ষ্ট্রবেরী ঢাকা ও চট্রগ্রামের বিভিন্ন আড়তে পাঠিয়ে দেন। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে এবার ফলনও বেশ ভাল হয়েছে দামও ভাল পাবেন বলে আশা করছেন তিনি। প্রতিদিন তিনি এবং ৫ জন শ্রমিক কাজ করেন এখানে।
২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত তার হাতে অর্ধ-শতাধিক বেকার যুবক এই ষ্ট্রবেরী চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে জানান মাহবুবুর রহমান হাফিজ।
নওগাঁ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মজিবুর রহমান জানান, উচ্চ শিক্ষিত ষ্ট্রবেরী চাষী মাহবুবুর রহমান হাফিজকে আমরা সবরকমের সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছি। এই ফল চাষে অনেক বেকার যুবককেও আমরা উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে মাহবুবুর রহমানের চাষকৃত ষ্ট্রবেরী বাগান দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ প্রতিনিয়তঃ দেখার জন্য আসেন এবং তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে অনেকে ষ্ট্রবেরী চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। মাহবুবুর রহমান হাফিজ ভবিষতে আরও বড় পরিসরে ষ্ট্রবেরী চাষ করবেন বলে জানান। এছাড়াও তিনি ষ্ট্রবেরীর পাশাপাশি পরীক্ষামূলক ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেছেন। অল্পদিনের মধ্যেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ড্রাগন, আঙ্গুর ও থাই পেয়ারা চাষ করবেন বলে জানান তিনি।
সানবিডি/ঢাকা/রাআ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













