সুইসাইড নোটে ৪ জনকে দায়ী করে গৃহবধূর আত্মহত্যা

জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২২-০৯-১৮ ২০:৫৩:০৮

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় জ্যোতি আগারওয়াল নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোটের ছবি তুলে মেসেঞ্জারে পরিচিত ব্যক্তিদের পাঠিয়েছিলেন তিনি।

রোববার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে গৃহবধূর মৃত্যুর খবরে স্বামীসহ পরিবারের লোকজন গা ঢাকা দিয়েছে।

ডায়েরির পাতায় লেখা দুই পৃষ্ঠার সুইসাইড নোটে জ্যোতি তার মৃত্যুর জন্য চারজনকে দায়ী করে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। অভিযুক্তরা হলেন, স্বামী সুমিত কুমার আগারওয়াল, শাশুড়ি উমা দেবী আগারওয়াল, দেবর অমিত কুমার আগারওয়াল ও জা ডা. অমৃতা কুমারী আগারওয়াল। এ ক্ষেত্রে তার দুই সন্তান একেবারে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।

নিহত জ্যোতি আগারওয়াল শহরের সুপরিচিত ব্যবসায়ী সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কির স্ত্রী। তার বাবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কি সৈয়দপুর উপজেলা হিন্দু কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঘুমের ওষুধ খেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন দুই সন্তানের মা জ্যোতি আগারওয়াল। তার একটি সুইসাইড নোটে উঠে এসেছে স্বামী-শাশুড়ি-দেবর-জায়ের নির্যাতনের চিত্র। এক সপ্তাহ আগে দুই পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে তার ছবি তুলে সৈয়দপুর হিন্দু কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের কাছে মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন জ্যোতি। কিন্তু কেউই তার ওপর পারিবারিক অত্যাচারের সুরাহা করতে এগিয়ে না আসায় গত বৃহস্পতিবার রাতে একসঙ্গে কয়েকটি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

এদিকে গুরুতর অসুস্থ হলে বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা টের পান। কবে তাৎক্ষণিক তাকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা করতে থাকেন নিক্কির ছোট ভাই অমিত কুমার আগারওয়ালার স্ত্রী ডা. অমৃতা কুমারী আগারওয়াল। এ সময় অবস্থার অবনতি হলে জ্যোতিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার সকালে তার মৃত্যু হয়।

সুইসাইড নোটে জ্যোতি লিখেছেন, আমার বিয়ে হয়েছে ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ি ও স্বামী-দেবর মানসিক নির্যাতন করছে। দেবরের বিয়ের পর জা অমৃতাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অত্যাচার চালিয়ে আসছে। ওরা আমাকে চারবার মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। বেঁচে আছি সেটা আমার ভাগ্য। আমাকে সাজিয়ে মিথ্যে বলে আমার গয়না ও জমানো টাকা নিয়েছে তারা। ফেরত দিবে বলে আজও দেয়নি। বরং টাকা ও গয়নার কথা বললেই অত্যাচারের মাত্রা বাড়ায়। গায়েও হাত তুলেছে সবাই মিলে। আমার মা-বাবা নেই। ভাইবোনদের জন্য বেঁচে ছিলাম। কে জানতো ওরা আমাকে মেরে ফেলবে? তাহলে তো ভাইবোনরা ছেড়ে দিত না। শাশুড়ি উমা দেবী আমাকে কখনও দেখতে পারেনি, ভালোও বাসেনি। আমার সংসার ভাঙার পেছনেও তার হাত রয়েছে। তিনি উল্টাপাল্টা বলে তার ছেলে সুমিতের কান ভরতো। এমনকি আমার বাচ্চা দুটোকেও এরা ভয় দেখিয়ে রাখে। এ কারণে তারা কিছু বলতে পারে না। বাচ্চাদের রক্ষার জন্যও আকুতি জানিয়েছেন জ্যোতি। মানুষ মৃত্যুর সময় কখনও মিথ্যে বলে না। বিশ্বাস না হলে কাজের লোক ও পাড়া-প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন। আমার শাশুড়ি অনেক অত্যাচার করেছে। ২১ বছর ধরে আমি শুধু কাঁদছি। ওরা কখনোই সুখের দিন দেখতে দেয়নি, আমার মৃত্যুর বিচার চাই’।

নিহতের স্বামী সুমিত কুমার আগারওয়াল নিক্কি বলেন, সুইসাইড নোট বলে যে উড়ো চিঠির কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। কারণ এটি আমার স্ত্রীর লেখা নয়। তার হাতের লেখার সঙ্গে কোন মিল নেই। প্রমাণ করবেন কিভাবে যে চিঠিটা জ্যোতি লিখেছে।

সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর খবর শুনেছি। তবে এখনও কোন অভিযোগ পাইনি, পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এম জি

Print Print