বিচি গেলে দেব হারামজাদা
আপডেট: ২০১৬-০৩-২৮ ০৯:০৪:২৯
ছোট বেলায় প্রতিবেশী বড় আপুরা শিখিয়ে দিয়েছিল কখনও কোন ধর্ষণের পরিস্থিতি হলে বিচি(অন্ডকোষ) জোরসে টিপে ধরে গেলে দিতে হবে। তাহলেই নাকি লোকটা মরে যাবে, আর ধর্ষিতা হতে হবে না।
তারপর থেকে টিভি সিনেমায় ধর্ষণ দৃশ্য আসলেই মনে মনে চিৎকার করে করে বলতে থাকতাম “বিচি গেলে দে,বিচি গেলে দে”। কিন্তু না, বাস্তবের মতো আমাদের সিনেমার পরিচালকদের মগজেও গেঁড়ে বসেছে সেই ধারণা – ধর্ষিতা হওয়া মানেই হল সেই মেয়ের সমাজে আর মুখ দেখানোর জো নেই। তাই দেখতাম সিনেমার ধর্ষিতারা সুইসাইড করতো।
সুইসাইডের বিকল্প অবশ্য আরেকটা ছিল – ধর্ষকের সাথে বিয়ে। দেখে মেজাজটাই খারাপ হয়ে যেত। একবার এরকম একটা সিনেমায় মান্নার বোন নাসরীন ধর্ষিত হল মিশা সওদাগরের হাতে। বোনের কান্নাকাটিতে মান্না মিশা সওদাগর কে ধরে বোনের সাথে বিয়ে দিল। আমি রেগে মেগে বলছি “এইটা কি করল,এইটা কি করল!” শুনে আমারই এক ফ্রেন্ড বলে “ঠিক ই তো আছে,মেয়েদের শরীরের একটা দাম আছে না?” আমি আকাশ থেকে পড়লাম, শরীরের দাম বলতে এরা বোঝে জানোয়ারের হাতেই স্বেচ্ছায় শরীর তুলে দেয়া! তখন অনেক অপরিণত, অনভিজ্ঞ মানুষ ছিলাম, তাই আকাশ থেকে পড়েছিলাম। এখন এমন পরিস্থিতি হলে আর অবাক হব না বিন্দুমাত্রও – এখন আমি জানি, এটাই আমাদের সমাজের মানসিকতা!
ধর্ষকের সমাজে বসবাস করে ছোট বেলার ওই বড় আপু দের শেখানো কৌশলটা মনে মনে কতবার যে রিভাইস করেছি! আর কত ছোটদের ও যে শিখিয়ে দিয়েছি। যখনই কোন রাস্তা একটু নিরিবিলি মনে হয়েছে, তখনই খুঁজে দেখেছি আশে পাশে কোনও ছেলে ছোকরা বা বদ ব্যাটা লোক দেখা যায় কিনা। তারা আড় চোখে তাকায় কিনা, ফলো করে কিনা। পেছনে পেছনে কেউ হাঁটে কিনা। আর মনে মনে আউড়েছি “বিচি গেলে দেব,বিচি গেলে দেব”।
একবার বান্ধবীর বাসা থেকে সন্ধ্যা বেলা বেরিয়ে সিঁড়িতে নামতে গিয়ে হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। কিছু বুঝে না বুঝেই বিকট চিৎকার করে বসলাম। বান্ধবীর পরিবার সাথে সাথে বেরিয়ে এলো আলো নিয়ে। দূর্ভাগ্য বশতঃ সিঁড়িতেই আবার কোথাও ছিল এক পুরুষ লোক। বেচারা কিছু না করেই পড়ে গেল বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। বান্ধবীর বোন ঘরে ডেকে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। লোকটা কি করেছে না করেছে এসব। মনে মনে বললাম “কিছু করলে তো ব্যাটার বিচি ই গেলে দিতাম”। বেচারা তো করেনি কিছুই, করেছে তো আজন্মের পাপের সমাজ ব্যবস্থা, যখন ধর্ষণ কি তাই জানি না, তখনই শেখানো হয়েছে-ধর্ষণ করতে আসলে বিচি গালতে হবে।
মনে পড়ে এক কাজিনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ধর্ষণ কি? বললো, টাচ করা। এই নিয়ে পড়ে গেলাম আরেক টেনশনে,কেউ টাচ করলে বিচি গেলে দিতে হবে! এরকম অবুঝ শৈশব থেকে যখন কোনো শিশুকে ধর্ষিতা হওয়ার জন্য সর্বক্ষণ মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়,তার অন্তরের অন্তঃস্থলে স্থায়ী ভাবে ভয়ংকর শঙ্কা ঢুকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেলে বদ্ধ সিঁড়ি ঘরে গলা দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে আসবার জন্য একদন্ড ভাবার অবকাশ আর এই সমাজে বেড়ে উঠা অসহায় মস্তিস্ক টি মেয়েটিকে দেবে না, এটাই স্বাভাবিক।
নিজের ভুল আচরণ নিয়ে বিব্রত হওয়া কিন্তু শেষ হয়নি ওই সিঁড়ির ঘটনায়। আরেকদিনের কথা, তখন আমি পড়ি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাস্টার্স কোর্স, স্বভাবতই ক্লাস রাতে। একদিন হঠাৎ ক্লাসে কারেন্ট চলে গেল,জেনারেটর আসতে কয়েক মুহূর্তের চেয়ে খুব বেশি সময় ও লাগে না। সেদিন আমার পাশে যে সহপাঠী বসেছিলেন সেই সহপাঠী বয়সে আমাদের অনেকেরই প্রায় পিতৃ সমতুল্য হওয়ায় আদর করে তাকে আমরা অনেক সময়ই চাচা ডাকি। কারেন্ট চলে যাওয়ায় কিছুই বুঝে না বুঝে এক সেকেন্ড ও ভাবার আগে কেমন করে যেন এক লাফ দিয়ে মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে নিয়ম মাফিক দাঁড়িয়ে পড়লাম। সচরাচর বাইরে কোথাও কারেন্ট চলে গেলে এটা করে থাকি বলেই হয়তোবা অভ্যাস বশত নিজের অজান্তেই এটা করে ফেলেছি। আমি জানি আমার ইনসিকিউর্ড সাবকনশাস মাইন্ড আমাকে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কাজটি করিয়ে নিয়েছে, তাই কাজ টি করতে গিয়ে হয়তো আর আমাকে কিছুই ভাবতে যেতে হয় নি। বলাই যায়, একটা রিফ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। ওদিকে মুহূর্তেই জেনারেটর চলে আসায় সবাই দেখল আমি সিট ছেড়ে রুমের মাঝখানে দু’হাত গুটিয়ে শুটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। সবাই হাসাহাসি করে বলতে থাকল “চাচ্চু রে বিশ্বাস করতে পারলা না,না? চাচার চেহারায় মনে হয় বদ বদ একটা ভাব আছে, নাকি বল?”। ওদিকে নিরীহ চাচা মিয়া বেচারাও লজ্জায় লাল টুকটুক করতে লাগল। আমার তো সত্যিই লজ্জার আর শেষ রইল না।
ক্লাশ শেষে যেহেতু ফিরতেও হতো রাতে, ব্যাগ এ সব সময় একটা এন্টি কাটার রাখতাম। দিনেও রাখতাম। বান্ধবী বা ছোটদের ও রাখতে পরামর্শ দিতাম। বিচি তত্ত্ব তো আছেই। এন্টি কাটার বা বিচি তত্ত্ব যদিও এখনও পর্যন্ত কোনোদিন কাজে আসেনি, কিন্তু বুকের ধুকধুকিটাও তো যায় নি কোনোদিন। মনে মনে ধর্ষিতা হবার প্রস্তুতিটা নিয়ে দাঁত কামড়ে চলাচল করছি আজকে কত হাজার বছর হয়ে গেল! কত হাজার বছর আমরা শারীরিক বা মানসিক কোন না কোনও ফর্ম এ ধর্ষিতা হয়েই চলেছি। ভয় শঙ্কা প্রতিনিয়ত আমাদের পাগলা কুকুরের মতো ধাওয়া করেই চলেছে। আমরা যারা এখনও শারীরিকভাবে ধর্ষণের শিকার হইনি, তারাও দৈনন্দিন সেই শঙ্কা মাথায় নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি। একটু অন্ধকার নেমে আসলেই বা একটু নিরিবিলি পথে রিকশা ঢুকলেই বুকের মধ্যে চলে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠোকা, আর মাথার মধ্যে চলে “বিচি গেলে দেব হারামজাদা”।
এভাবে বিবেচনা করলে যে ক’জন আক্ষরিক অর্থে ধর্ষিতা হচ্ছে,তার চেয়েও অনেক অনেক গুন বেশি দাঁড়াবে সেই সংখ্যা আমরা যারা প্রতিনিয়ত শঙ্কা দ্বারা ধর্ষিতা হচ্ছি। বলতে গেলে প্রতিটি মেয়ে সেই শৈশব থেকে শুরু করে ধর্ষণের শঙ্কা নিয়ে প্রতিনিয়ত হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে জীবন যাপন করছি। যারা ধর্ষিতা হচ্ছি তারা তো হচ্ছি ই,আর যারা ভাগ্য গুণে ধর্ষনের হাত থেকে বেঁচেও যাচ্ছি তারাও ধর্ষণের পাগলা কুত্তার তাড়ার শঙ্কা থেকে বাঁচতে পারছি না। এই কুকুর তাড়ানো দৌড়ের ওপরেই আজীবন রয়েছি। আক্ষরিক অর্থে ধর্ষিতা হলাম বা নাই হলাম হয়রানিটা কিন্তু হলাম ষোল আনাই।
লেখক: সংগীত শিল্পী, ব্লগার।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














