তনুর প্রেমের সম্পর্ক ছিল, এমন স্বীকারোক্তি আদায়ে পরিবারকে চাপ

আপডেট: ২০১৬-০৩-২৮ ১৪:০১:৪১


Tanus Famalyনাট্যকর্মী ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর মা-বাবা ও চাচাতো বোনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, সোহাগীর সঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজের কোনো শিক্ষার্থীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল—এমন স্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

সোহাগীর মা আনোয়ারা বেগম, বাবা মো. ইয়ার হোসেন ও চাচাতো বোন লাইজু জাহানের সঙ্গে গতকাল রোববার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অতিথিকক্ষে কথা হয়। তাঁরা সেনানিবাস এলাকা থেকে বেরিয়ে মুরাদনগরের মির্জাপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী খুন হওয়ার সাত দিন পরও সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত শুক্রবার রাতে ও শনিবার সোহাগীর পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে সোহাগীর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এক কথা আশি বার জিগগাস করছে। কন ভিক্টোরিয়া কলেজের কার সঙ্গে তনুর সম্পর্ক আছল। আমি তো মেয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে গেলে খোঁজ রাখছি। ভেতরে তো খোঁজ রাখি নাই। এইখানে সে ছোট বেলা থেকে বড় হইছে। সব অনুষ্ঠানে নাচগান করছে। নাটকও করছে। কোনো দিন কোনো কথা উঠে নাই। এখন মেয়ে নাই হাজারটা কথা উঠতেছে।’

সোহাগীকে কেন তাঁর মা-বাবা বিয়ে দেননি এমন প্রশ্নও উঠেছে। সোহাগীর বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিবারের অন্য আত্মীয়দের মধ্যে কারও সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হচ্ছে। এসব জানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এইগুলা কী জিগাস করে। ক্যান করে? তনুর খুনের সঙ্গে এগুলার কী সম্পর্ক?’

সোহাগীর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি তো আমার মেয়ের খুনের বিচার চাই। আমার থাইকা নাম জানতে চায়। আমি কার নাম বলব।’ চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘তনু আমার একমাত্র মেয়ে। সে নাচগান করতে ভালোবাসত। কোনো দিন তার কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখিনি। পড়ালেখা শেষ করে সে সেনানিবাসের ভেতরের স্কুলগুলোয় নাচগানের শিক্ষক হতে চেয়েছিল।’

র‍্যাব-১১ কুমিল্লার উপপরিচালক মেজর মো. খুরশীদ আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আনা হয়েছিল। তাই সোহাগীর মা ও ভাইবোনকে আনা হয়েছিল। তাঁরা কাউকে আটক করেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত একটা চলমান প্রক্রিয়া। তার অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০ মার্চ সন্ধ্যায় টিউশনি করে বাসায় ফেরার পথে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় সোহাগী জাহান তনুকে। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ময়নামতি সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাওয়ার হাউসের পানির ট্যাংক সংলগ্ন স্থানে সোহাগীর মরদেহ পাওয়া যায়। কালভার্টের পাশে ঝোপের ভেতর মাথা থেতলানো সোহাগীর অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরের দিন নিহতের বাবা ইয়ার হোসেন কোতয়ালী মডেল থানায় অজ্ঞাতদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকান্ডের সাত দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার কিংবা হত্যার রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি। তনু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে শুক্রবার মামলাটি জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, কুমিল্লা নগরী ছাড়াও ঘাতকদের বিচারের দাবিতে তনুর গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরের গ্রামবাসী, জেলার চান্দিনা, দেবিদ্বার, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, তনুর খুনিদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে বুধবার সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক ঘণ্টা বন্ধ রাখার ডাক দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। রবিবার সকালে ঢাকা থেকে রোড মার্চ করে বিকালে কুমিল্লায় পৌঁছে কান্দিরপাড়ে আন্দোলনরতদের সঙ্গে সংহতি সমাবেশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। পরে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এই ডাক দেন।

ইমরান সরকার বলেন, সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষক ও খুনিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে ৩০ মার্চ বুধবার সারাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেলা ১২টা থেকে এক ঘণ্টা বন্ধ থাকবে। সারাদেশের সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে বিচার দাবিতে মানববন্ধন করবেন এই এক ঘণ্টা। এসময় তিনি হত্যাকারীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেন