অতিথি এসেছে রক্তের টানে, আঘাত করবেন না

সানবিডি২৪ প্রতিবেদকফাহমিদ জামান আপডেট: ২০২৩-০৩-২২ ২০:৪৯:০০


উত্তরাঞ্চলের জেলা দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী বিরল ‍উপজেলার ৮ নম্বর ধর্মপুর ইউনিয়নের শালবনে সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অনু্প্রবেশ করা একটি বিলুপ্ত প্রজাতির নীলগাই আশ্রয় নিয়েছে। গত কয়েকদিন থেকেই ধর্মপুর বীটের শালবনের বিভিন্ন জায়াগায় নীলগাইটিকে চলাফেরা করতে ও ঘাস খেতে দেখা গেছে। নীলগাইটি বন্য পরিবেশে নিরাপদ রাখতে সাধারণ জনগণকে সচেতনতার পাশাপাশি নজরদারিতে রেখেছে বন বিভাগ।

আজ বুধবার (২২ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পাই,স্থানীয় কৌতুহলী জনগন নীলগাইটিকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষের তাড়া খেয়ে বিস্তৃর্ণ মাঠ জুড়ে নীলগাইটি বিরামহীনভাবে ছোটাছুটি করছে। স্থানীয় সচেতন কয়েকজন ব্যক্তিসহ আমরা তাদেরকে থামানোর চেষ্টা করি। কিছু সময় পর নীলগাইটি স্থির হয়ে ভারতীয় সীমান্তের গেটের পাশাপাশি জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকে। ভারতীয় কিছু জনগন এবং দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু সদস্য নীলগাইটি নিয়ে যাওয়ার জন্য সীমান্ত গেট খুলে দিয়ে নীলগাইটিকে ঘিরে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকে। সেসময় আমরা নীলগাইটিকে না নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের প্রতি অনুরোধ করি। তবে তারা অব্যাহত চেষ্টা করতে থাকে। একপর্যায়ে আমাদের সঙ্গে থাকা লোকজন একটু চিৎকার দিলে নীলগাইটি আবার বাংলাদেশে এসে প্রবেশ করে।

পরবর্তীতে আমরা বনবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা পুলিশ সদস্যদের পাঠিয়ে উৎস্যুক জনতাকে তাড়িয়ে দেয়। নীলগাইটি সেই মুহূর্তে কিছুটা স্থির হয়ে সীমান্তবর্তী শালবাগানে অবস্থান করে।

আমরা এতটাই বোধশূন্য নিষ্ঠুর হয়ে গেছি যে অতিথি একটি প্রাণী সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভালোবেসে আমাদের দেশে অবস্থান নিয়েছে। তাকে আমরা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। এর চেয়ে লজ্জাকর আর কি হতে পারে। গত বছরও একটি নীলগাই সীমান্ত পেরিয়ে বিরলের ধর্মপুর শালবনে আশ্রয় নিয়েছিলো। তবে সাধারণ জনগণের তাড়া খেয়ে নীলগাইটি স্ট্রোক করে মারা গিয়েছিলো। প্রশাসনের কর্তাদের প্রতি আকুল আবেদন এবারও যেন গতবছরের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

নীলগাইটিকে নিরাপদভাবে বিচরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

জানা যায়, ১৯৪০ পর্যন্ত বাংলাদেশের জঙ্গলে নীলগাইয়ের অস্তিত্ব লক্ষ করা গেছে। এর পরবর্তী সময়ে দেশের কোনো স্থানে আর এদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুগ যুগ ধরে শিকারিরা সুন্দর চামড়া ও সুস্বাদু মাংসের লোভে এদের গুলি করে হত্যা করেছে। দেশে টিকে থাকা সর্বশেষ নীলগাইটিকে শিকারির গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল।

একসময় দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুরের শালবনে প্রচুর পরিমাণে নীলগাই ছিল। সমভূমির শালবন ছিল ওদের প্রিয় বিচরণ ক্ষেত্র। তখন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিকারিরা উত্তরবঙ্গে ছুটে যেতেন নীলগাই শিকারের জন্য। খ্যাতনামা লেখক প্রয়াত আবুল খায়ের মুসলেউদ্দিন একবার উত্তরবঙ্গে নীলগাই শিকারে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই শিকারকাহিনিটি উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে (১৯৯১-৯২) স্থান পেয়েছিল।

তবে দু:খের বিষয়ে বাংলাদেশের বর্তমানে একটিও নীলগাই বন্য অবস্থায় টিকে নেই। সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত এক প্রাণী আর প্রকৃতি থেকে কোনো প্রাণীর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত খারাপ লক্ষণ। আমরা ওদের ধরে রাখতে পারিনি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশটি পেরেছে। এখনো ওখানে প্রায় লক্ষাধিক নীলগাই রয়েছে।

তাই রক্তের টানে মাঝেমধ্যে ওরা ছুটে আসে পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থানের দিকে। আর আমরা ওদের অচেনা প্রাণী মনে করে ঝাঁপিয়ে পড়ি আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে। আমাদের মনে একবারও এই প্রশ্ন আসে না, এত সুন্দর একটা প্রাণীকে নিজেরা ধরে রাখতে পারেনি, এটাই তো কত লজ্জার কথা!

এর পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে নীলগাইয়ের মতো আরও অনেক বন্য প্রাণী এগিয়ে যাবে বিলুপ্তির পথে। আসুন না আমরা সকলে রক্তের টানে ফেরা নীলগাইটি স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিই। কারো আঘাতে তার যেন মৃত্যু না হয়। বা মনের দু:খে যেখান থেকে এসেছিলো সেখানে ফিরে না যায়।