যেভাবে পুনর্গঠন হতে পারে বিপর্যস্ত জামায়াত

আপডেট: ২০১৬-০৫-১১ ১০:১২:২০


jamatবাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে মঙ্গলবার রাতে। এ নিয়ে দলটির শীর্ষ প্রায় সব ক’জন নেতাকেই একাত্তুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলানো হলো।

দলের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি তাদের ইতিহাসে ভয়াবহ বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তিনবার এই দলটি নিষিদ্ধ হলেও নেতাকর্মী ও সমর্থকদের এমন সংকটকাল অতিক্রম করতে হয়নি কখনো।

মানবতাবিরোধী অপরাধে একের পর এক শীর্ষনেতাদের ফাঁসি বা আজীবন কারাদণ্ড এবং তাদের মুক্তির জন্য দেশব্যাপী হরতাল অবরোধসহ সহিংস আন্দোলন করতে গিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মী কারারুদ্ধ ও ফেরারি জীবনযাপন করছেন।

হাইকোর্টের রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতেরও বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শীর্ষনেতাদের মতো শেষ পর্যন্ত সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে পারে-এমন আশঙ্কায় রয়েছেন দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তবে, চূড়ান্তভাবে সরকার বা আদালত জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত নতুন কোনো নামে বা আলাদা প্লাটফরমে যাওয়ার কথা ভাবছে না দলটির বর্তমান নেতৃত্ব। তবে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত আমির ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল দিয়ে চলে আসা শীর্ষ পদ দুটিতে বিতর্কমুক্ত তরুণ মুখ আসছেন বলে জামায়াত সূত্রে জানা গেছে। একইভাবে দলের নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ ও মজলিশে শুরা পুনর্গঠন হচ্ছে। খুব শিগগিরই এসব পদে পরিবর্তন আসছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সূত্রটি জানায়, আদালতের আদেশে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় এখনই নতুন নামে রাজনৈতিক দল করার কথা ভাবছে না জামায়াত। সরকার বা আদালত যদি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে তার পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন দল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্তে যাবেন নেতারা।

রাজশাহী বিভাগের জামায়াতের নেতা ও একটি উপজেলার চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নতুন দল গঠনের বিষয়ে আপনারা যারা পত্রপত্রিকায় লিখছেন এবং বলছেন যে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। এসব তথ্য সঠিক নয়। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড কি নিষিদ্ধের আগেই নতুন দল করেছিল? কিংবা তুরস্কের একে পার্টি..? করে নাই। আমরা কেন আগ বাড়িয়ে এটা করতে যাব। তবে, হ্যাঁ জামায়াত নিষিদ্ধ হলে পরবর্তী করণীয় আমাদের নেতারা ঠিক করে রেখেছেন।’

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামায়াত। এক বছরের মাথায় মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষনেতারা গ্রেফতার হন। তাদের মুক্তি এবং সরকার পতনের আন্দোলন করতে গিয়ে সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী কারারুদ্ধ ও ফেরারি জীবনযাপন করতে শুরু করেন। ঢাকার মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও পুরানা পল্টনে মহানগর কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়গুলো তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতার হয়ে বিচারাধীন অবস্থায় মারা যান দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর একেএম ইউসুফ। আমৃত্যু কারাদণ্ড অবস্থায় মারা যান সাবেক আমীর গোলাম আযম। আজীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এছাড়া সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মাদ কামারুজ্জামান এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারে আছেন অন্য তিন শীর্ষ জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুস সুবহান, এটিএম আজহারুল ইসলাম ও মীর কাসেম আলী। নাশকতার মামলায় কারাগারে আছেন নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক গোলাম পরোয়ার। অসুস্থজনিত কারণে মারা গেছেন নায়েবে আমীর অধ্যাপক নাযির আহমাদ। দেশ ছেড়েছেন সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে দল চালাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। আত্মগোপনে রয়েছেন ঢাকা মহানগর আমীর রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদের সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ,অধ্যাপক তাসনিম আলম,আব্দুল্লাহ মো. তাহের,মাওলানা আব্দুল হালিম, নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও।

জামায়াতের গঠনতন্ত্র থেকে জানা যায়, দলটির আমির নির্বাচনের সময়সীমা তিন বছর। তবে গত বছরের জুনে দলের মুদ্রিত গঠনতন্ত্রের ৫৯তম সংস্করণের ধারা ১৫-এর ৬ এর (ঘ) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জামায়াতের আমির নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি কিছুতেই সম্ভব না হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত আমির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ পদে বহাল থাকবেন।’ এ কারণে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা তৈরি না হওয়ায় তিন বছরের জায়গায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ দুই সেশন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর শাখার একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার বা আদালত থেকে জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই আগেই আমরা নতুন প্লাটফরমে যাব না। সরকারের সিদ্ধান্তের পরই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

সূত্র জানায় নিজামীর রায় কার্যকরের পরপরই জামায়াতের আমির নির্বাচন ও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনয়নসহ নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ ও শুরা সদস্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে।। তবে, রুকন সম্মেলনের মাধ্যমে আমির নির্বাচনের সুযোগ না থাকায় ভিন্নপন্থায় রুকনদের ভোট বা মতামত নিয়ে আমিরসহ অন্যান্য পদে নেতা নির্বাচনের চিন্তা-ভাবনা করছে জামায়াত। জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত দলটির ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্বে থাকা মকবুল আহমাদই ভারমুক্ত হয়ে আমির এবং ডা. শফিকুর রহমান সেক্রেটারি জেনারেল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তবে, এর ব্যত্যয় ঘটলে নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বা ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান আমির হতে পারেন। ঢাকা মহানগর কমিটির আমির রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যাপক তাসনীম আলম ও হামিদুর রহমান আযাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজন সেক্রেটারি জেনারেল হতে পারেন বলে জামায়াতের সূত্রটি জানিয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতার অভিযোগ নেই। ষাটের নিচে বয়স এবং অনেকেই আওয়ামী পরিবারের সন্তান।

এর বাইরে নায়েবে আমির, সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল, সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ ও মজলিশে শুরা কমিটি পুনর্গঠন হবে। এতে গত তিন দশকের ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব দিয়ে আসারাই জায়গা পাবেন বলে জানা গেছে।

জামায়াতের সংশ্লিষ্ট সূত্রটি বলছে, শেষ পর্যন্ত যদি জামায়াত নিষিদ্ধই হয়, তাহলে আরো অল্প বয়সী তরুণদের দিয়ে নতুন নামে বা প্লাটফরমের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবে। আর ষাট বা ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক অভিজ্ঞ নেতারা রাজনৈতিক মাঠে না থেকে সমাজসেবামুলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্বকে পরামর্শ দেবেন।