জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : অগ্রযাত্রার এক দশক

|| প্রকাশ: ২০১৫-১০-১৯ ১৭:৩১:৫৮ || আপডেট: ২০১৫-১০-১৯ ১৭:৩১:৫৮

Hafizulআজ ২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ব্রাহ্ম স্কুল(১৮৫৮) থেকে জগন্নাথ স্কুল(১৮৭২), তারপর জগন্নাথ কলেজ(১৮৮৪) এবং সর্বশেষ ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের বিবর্তনে একটি স্কুল-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার ইতিহাস জগতে বিরল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সেই বিরল ইতিহাসেরই অংশ।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নাম অনুসরণে এ প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ। দেশে বর্তমানে যে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয় যাকে ইংরেজীতে ইউনিভার্সিটি বলা হয় সে শব্দটির উদ্ভব ল্যাটিন শব্দ ইউনিভার্সিট্যাস (universitas) থেকে। ইউনিভার্সিট্যাস বা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে মূলত এমন একটি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে বুঝায় যেখান থেকে গ্র্যাজুয়েট ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের ডিগ্রী প্রদান করা হয়। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় ইউনিভার্সিটি শব্দটি দ্বারা শিক্ষক ও গবেষকদের কমিউনিটিকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় হলো গবেষণার এমন একটি স্থান যেখানে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের সবাই প্রকৃতিগতভাবে গবেষক।

শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম প্রসারের লক্ষ্যে নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গে সর্বপ্রথম ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় যার যাত্রা শুরু হয়েছিলো তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা কলেজের কিছু ছাত্র এবং চেয়ার টেবিল নিয়ে। পরবর্তীতে সময়ের প্রয়োজনে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, জাহাঙ্গীরনগরসহ আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় যাদের জন্ম ইতিহাস প্রায় একই রকম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অন্যান্য পাবলিক বিশ্বদ্যিালয়ের ঠিক বিপরীত।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করেছে কিছু নবনির্মিত অবকাঠামো আর সল্প সংখ্যক শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুর করেছিলো ২০টি বিভাগ, ২৮১ জন শিক্ষক এবং প্রায় ৩৮,৫০০ ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে যাদের প্রায় সকলেই উত্তরাধিকারসূত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। অবশ্য বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২টি বিভাগ, একটি ল্যাংগুয়েজ সেন্টার এবং একটি ভাষা ও শিক্ষা গবেষণা ইন্সস্টিটিউট রয়েছে যেখানে কর্মরত সর্বমোট শিক্ষক সংখ্যা ৫৫৮ জন এবং অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ১৮,৪৩৫ জন।

২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে জগন্নাথে ২,৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এরাই মূলত প্রকৃত অর্থে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্র-ছাত্রী। ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষে প্রতি আসনের বিপরীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু প্রতিযোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৭। তীব্র প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট সংখ্যাই প্রমান করে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে কতোটা মান সম্পন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান প্রথম উপাচার্য হিসেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. আবু হোসেন সিদ্দিক এবং অধ্যাপক ড. মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদ অলংকৃত করেন। ২০১৩ সালের ২০মার্চ বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।

বর্তমান উপাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগ, চারুকলা বিভাগ, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সস্টিটিউট এর মতো বাস্তবমুখী বিভাগসমূহ চালু হয়েছে। চারুকলা বিভাগ এবং নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরীর পাশাপাশি নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে বিশইবদ্যালয়টি পুরনো ঢাকাবাসীর কাছে শিক্ষা সংস্কৃতি ও বিনোদনের একটি আকর্ষনীয় স্থানে পরিণত হতে চলেছে। হয়ত অচিরেই এ বিশ্ববিদ্যালয়টি পুরনো ঢাকায় একটি নব জাগরণ সৃষ্টি করবে।

শিক্ষকদের গড় বয়সের কারণেও এ বিশ্বদ্যিালয়টি একটি সম্ভাবনাময় বিশ্বদ্যিালয় হিসেবে স্বকৃীত। কারণ, তরুণ মেধাবী ও উদ্যোমী শিক্ষকদের মিলনমেলা হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষকদের প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রভাষক, ৪৬ শতাংশ সহকারী অধ্যাপক, ৯ শতাংশ সহযোগী অধ্যাপক এবং ১০ শতাংশ অধ্যাপক।

তরুণ শিক্ষকদের প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং প্রায় ১০ শতাংশ বাংলাদেশে গবেষণা করছেন। শিক্ষকদের পাশাপাশি ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি কোর্সে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়েছে। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্বদ্যিালয়ে এম.ফিল কোর্সে অধ্যয়নরত গবেষক ৭৪জন এবং পিএইচ.ডি কোর্সে অধ্যয়নরত গবেষক ৩০জন। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই গবেষণা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে এর সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী অর্জন করা ছাত্র-ছাত্রীরা বিগত কয়েক বছর যাবত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আসছে।

আশা করছি অচিরেই প্রথম স্থানও অধিকার করবে। বিসিএস পরীক্ষা ছাড়াও এ বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন ব্যাংক বীমাসহ বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছে এবং করছে। মাত্র এক দশকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অর্জন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রকৃত অর্থে এ সময়কাল এক দশকও নয়। কারণ পুরনো বিভাগগুলো থেকে চার থেকে পাঁচটি ব্যাচ এবং নতুন বিভাগগুলো থেকে একটি বা দুটি ব্যাচ পাশ করে বেরিয়েছে এবং কোনো কোনো নতুন বিভাগ থেকে এখনো ছাত্র-ছাত্রীরা স্নাতক পাশ করে বেরোনোর সময় হয়নি। সুতরাং সময়ের বিবেচনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন অন্য যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটু বেশিই।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মীজানুর রহমানের গতিশীল নেতৃত্বের কারণে অবকাঠামোগত দিক দিয়েও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, ছাত্রীদের জন্য নির্মানাধীন ২০তলা আবাসিক হল, নিজস্ব অর্থে কেরানীগঞ্জে প্রায় ২০ বিঘা জমি ক্রয় ইত্যাদি। শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা দুরীকরণসহ ক্যাম্পাসের কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণাখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং রাজস্ব বাজেট বৃদ্ধি সম্ভব হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়টি অবশ্যই এ যুগের একটি শ্রেষ্ঠ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দেবে।

সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মেইল: [email protected]