এক বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা উধাও
সুইস ব্যাংক থেকে বিস্ময়কর গতিতে টাকা সরিয়েছে বাংলাদেশীরা
::গিয়াস উদ্দিন আপডেট: ২০২৩-০৬-২২ ২৩:১৯:৫৭
বিস্ময়কর গতিতে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংক (সুইস ব্যাংক) থেকে টাকা সরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশিরা। এক বছরে ১০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ৫ কোটি ৫২২ লাখ সুইস ফ্র্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৬৮৪ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্র্যাংক ১২৪ টাকা হিসেবে)। আগের বছর যা ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক। এ হিসেবে এক বছরে ৯৫ শতাংশ কমেছে।
বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে কোনো বাংলাদেশি তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করলে, তার তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুইস ব্যাংকের বাইরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের অর্থ পাচার বাড়ছে। তাদের মতে, অনিশ্চয়তার কারণে বিত্তবানরা দেশকে নিরাপদ মনে করছেন না। ফলে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ পাচার হচ্ছে। ঋণের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ এবং ঘুষ দুর্নীতির টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তবে সুইস ব্যাংকে আমানতের দিক থেকে এ বছর বিশ্বে প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্য।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন শুধু সুইস ব্যাংক নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের তথ্য আসছে। বিষয়টি অত্যান্ত উদ্বেগজনক। কারণ সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের যে টাকা রাখা হয়েছে, বড় অংশই মূলত দুর্নীতির।
তবে সুইস ব্যাংকে ব্যাংলাদেশিদের আমানত দুইভাবে দেখানো হয়। প্রথমত দেশটির ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকের লেনদেন এবং দ্বিতীয়ত গ্রাহকের আমানত। ২০২১ সালে গ্রাহকের আমানত ছিল ২ কোটি ৬০ লাখ ফ্র্যাংক। এবছর তা বেড়ে ৩ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে গত বছর ব্যাংকের আমানত ছিল ৮৪ কোটি ৪০ লাখ ফ্র্যাংক। এবছর তা কমে ১ কোটি ৯০ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। এর মানে হলো গ্রাহকের আমানত বাড়লেও ব্যাংকিংখাতের আমানত কমে এসেছে।
বাংলাদেশিদের আমানত : ২০২২ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৫ কোটি ৫২ লাখ ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে যা ছিল ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক। ২০২০ সালে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৯ সালে ৬০ কোটি ৩০ লাখ। ২০১৮ সালে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ। ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ। তবে শুধু সুইস ব্যাংক নয়, অন্যান্য সংস্থা থেকেও টাকা পাচারের তথ্য আসছে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষনা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে টাকা পাচার হয়। বাংলাদেশের বিত্তবানরা নিজ দেশে তাদের সম্পদ রাখাকে নিরাপদ মনে করছে না। তাই তারা বিদেশে টাকা পাচার করছে।
আর্ন্তজাতিক ৬টি সংস্থার রিপোর্টে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য আসছে। এগুলো হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিক্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে) প্রকাশিত পানামা প্যারাডাইস ও পেনডোরা পেপার্স, জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) রিপোর্ট এবং মালয়েশিয়া প্রকাশিত সেদেশের সেকেন্ড হোম রিপোর্ট। এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে বেশ কিছু বাংলাদেশির অর্থপাচারের তথ্য মিলেছে। গত বছরে ডিসেম্বরে প্রকাশিত জিএফআইর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬ বছরে দেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার ১১২ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতি বছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের আমানত : সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে এ বছর প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্য। ২০২২ দশটির আমানতের পরিমাণ ২৯ হাজার ৯৪৩ কোটি ফ্র্যাংক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৩ হাজার ১০৯ কোটি, সিঙ্গাপুর ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি, চীন ১ হাজার কোটি ফ্র্যাংক, রাশিয়া ১ হাজার ৫২৫ কোটি, সোদি আরব ৫২১ কোটি, ভারত ৩৪০ কোটি, পাকিস্তান ৩৮ কোটি, জাপান ১ হাজার ৩৪২ কোটি এবং নেপালের ৪৮ কোটি সুইস ফ্র্যাংক আমানত রয়েছে।
পাচারের অর্থ ফেরানোর উদ্যোগ : এদিকে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে অর্থ পাচারকারীদের বিশেষ সুযোগ দিয়েছিল সরকার। কেউ ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে এনে বৈধ করতে পারবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত ১ টাকা ফেরত আসেনি। তবে এ ধরণের সুযোগের সমালোচনা করছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে দেশে একজন নিয়মিত করদাতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দেন। সে হিসেবে অর্থ পাচারকারীদের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের টাকার পুরোটাই দেশ থেকে পাচার হয়েছে, তা বলা যাবে না। তবে সিংহভাগই পাচার। তিনি বলেন, শুধু সুইস ব্যাংক নয়, আরও অনেক দেশে টাকা পাচার হয়েছে। এরমধ্যে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই টাকা গেছে। মোট ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে পাচার হয়েছে, এটা মোটামুটি বলা যায়। আর এই অর্থ পাচারের সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। পরস্পর মিলে মিশেই একাজ করছে।
মোট আমানত : প্রতিবেদন অনুসারে আলোচ্য সময়ে বিশ্বের সবগুলো দেশের আমানত বেড়েছে। আলোচ্য বছরে সুইজারল্যান্ডের ২৫৬টি ব্যাংকে বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে যা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ফ্র্যাংক। এ হিসেবে এ বছরে আমানত কমেছে ২৫ হাজার ফ্র্যাংক।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














