‘পড়া হয়নি কেন’ বলেই ছেলে-মেয়েকে খুন

আপডেট: ২০১৬-০৬-১৪ ১৫:৩৮:০৫


bonosri
ছবি: বাংলামেইল

রাজধানীর বনশ্রীতে চাঞ্চল্যকর দুই শিশু হত্যা মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করেছে পুলিশ। আগামীকাল বুধবার আদালতে এ চার্জশিট জমা দিতে পারে মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)।

চার্জশিট অনুযায়ী, মা মাহফুজা মালেক জেসমিনই ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে দু’শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। প্রথমে হত্যা করা হয় ১২ বছর বয়সী মেয়ে নুসরাত আমান অরণীকে। তাকে হত্যা করতে সময় নেয় ১৫ মিনিট। হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ফ্লোরে ফেলে রেখে খাটে ঘুমন্ত ৭ বছরের ছেলে আলভী আমানের মুখ চেপে ধরে একইভাবে হত্যা করেন জেসমিন।

তবে দুই সন্তানকে হত্যার পরও জেসমিন ছিলেন নির্বিকার, নির্লিপ্ত। বরং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভিন্ন খাতে ঘুরাতে স্বামী ও বোনকে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, আগের রাতে রেস্টুরেন্ট থেকে আনা খাবার খেয়ে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তারা কোনো কথা বলছে না। নড়াচড়াও করছে না। দ্রুত বাসায় এসে সন্তানদের হাসপাতালে নেয়ার অনুরোধও করেন তিনি। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিবির প্রস্তুত করা চার্জশিটে বলা হয়েছে, সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই জেসমিন তাদের হত্যা করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি বাসার মধ্যে দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়। তারা ঠিকমতো লেখাপড়া না করায় দুশ্চিন্তা করতেন তিনি। ভাবতেন, তারা মানুষের মতো মানুষ হতে পারবে না। বড় হয়ে কী করবে তারা? অন্যের ছেলেমেয়েরা তো ভালো রেজাল্ট করে, তার বাচ্চাদের এমন অবস্থা কেন। তাই দুই সন্তানের জন্য পৃথক তিনজন গৃহশিক্ষিকা রেখেছিলেন তিনি।

বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এক শিক্ষিকার কাছে ইংরেজি ও বিকাল ৪টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত আরেক শিক্ষিকার কাছে অংক করত অরণী। বাসায় এসে শিক্ষিকারা পড়িয়ে যেতেন। আলভীকে পড়াতেন আরেক শিক্ষিকা। কিন্তু এরপরও তারা পড়ালেখায় ভালো করছিল না ভেবে জেসমিন দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হয়ে পড়েন।

একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, দুই ছেলেমেয়েকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে তাকে আর দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না। এ থেকেই ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের দিকে দু’সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ আগে কয়েকবার অরণীকে গলা টিপে ধরার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় হত্যা করতে পারেননি।

২৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর দেড়টার দিকে স্কুল থেকে বাসায় ফেরে অরণী। এর আগে ১২টার দিকে আলভীকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসেন জেসমিন। দুপুরে তাদের খাবার খাওয়ায়। অরণী পৃথক দু’শিক্ষিকার কাছে প্রাইভেট পড়ে। এসময় বেডরুমে আলভীকে নিয়ে শুয়েছিলেন জেসমিন। বিকাল ৫টায় শিক্ষিকা চলে যাওয়ার পর অরণী মায়ের কক্ষে ঢোকে। পড়া ঠিকভাবে হয়েছে কি-না অরণীর কাছে জানতে চান জেসমিন। অরণী বলে, ইংরেজি পড়া দিতে পারেনি সে। সঙ্গে সঙ্গে শোয়া থেকে উঠে জেসমিন অরণীর গলা টিপে ধরেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ফ্লোরে পড়ে যায় মা-মেয়ে। এরপর অরণীর গায়ের ওপর বসে জেসমিন অরণীর ওড়না দিয়েই ১৫ মিনিট মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করেন।

মেয়েকে হত্যার পর জেসমিন ভাবেন, এক সন্তানকে যখন মেরেই ফেলেছেন, আরেক সন্তানকেও বাঁচিয়ে রাখবেন না। তাকে বাঁচিয়ে রাখলেও তো দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে। এরপর ঘুমন্ত আলভীকে একই ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে হত্যা করা হয়।

তাদের হত্যার পর বিষক্রিয়ায় মারা গেছে বলে অপপ্রচার চালান তিনি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ মিলেছে।

যদিও লাশ উদ্ধারের পর জেসমিন দাবি করেছিলেন, বিষক্রিয়ায় তারা মারা গেছে। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষায় বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রাসায়নিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, তারা বিষক্রিয়ায় মারা যায়নি। ডিএনএ পরীক্ষায় জেসমিনের ডিএনএর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রমাণ পেয়েছেন, দুই শিশুকে হত্যা করেছে তাদের মা জেসমিন। চার্জশিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক লোকমান হেকিম বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, রাসায়নিক ও ডিএনএ রিপোর্ট এবং নিবিড় তদন্তে ৩০২ ধারায় জেসমিনের অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তিনিই তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। পড়া হয়নি কেন- এ কথা বলে তিনি প্রথমে মেয়েকে, পরে ঘুমন্ত ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির ৫ম তলার ভাড়া বাসায় স্ত্রী জেসমিন, এক মেয়ে অরণী ও ছেলে আলভী এবং বৃদ্ধা মাকে নিয়ে থাকতেন গার্মেন্ট এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ আমান। তার গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলায়। সন্তানদের হত্যার অভিযোগে র্যাবের হাতে ১ মার্চ আটক হন জেসমিন। রামপুরা থানায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে সন্তান হত্যার মামলা দায়ের করেন আমানউল্লাহ। মামলাটি স্থানান্তর হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) খিলগাঁও জোনাল টিমে।

মামলার তদারকি কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার ইকবাল হোছাইন সোমবার বলেন, মামলার চার্জশিট প্রস্তুত হয়েছে। কোনো সমস্যা না হলে বুধবার আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। মামলার একমাত্র আসামি জেসমিন কারাগারে রয়েছেন।

সানবিডি/ঢাকা/এসএস