বাচ্চাগো লয়ে বাঁচতে তো হবে!
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-১৪ ২১:৫১:০৯
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাত ৯টা। রাতের আকাশে তারা জ্বলজ্বল করছে। রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের আলো। এমন আলো-আধারির মাঝে আড্ডায় মেতেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। কন্ঠে গান আর করতালি। পরনে সাদা গেঞ্জি আর ছেঁড়া প্যান্ট পরিহিত একটি ছেলে হঠাৎ আড্ডাস্থলে হাজির। মাথায় বাঁশের চাঁটাইয়ের ছোট্ট ঝুড়ি। ঝুঁড়ির মধ্যে সাদা কাগজের ঠোঙায় মোড়ানো বাদাম। ছেলেটি বলে বাদাম নিবেন? মিনিট বাদেই ছেলেটির পেছনে দেখা যায় মধ্যবয়সী এক নারীকে। কোলে তার ছোট শিশু। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদে বাদাম বিক্রেতা শুভর কথা।
শুভর সঙ্গে দেখা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু ভবনের সামনে। কথা হলো আট বছর বয়সী শুভর সঙ্গে। পাশের মানুষটি কে? জিঙ্গেস করতে ছেলেটি বলে আমার মা আর ছোট ভাই জিসান। আড্ডারত শিক্ষার্থীদের একজন শহিদুল জিজ্ঞেস করে, বাদাম কতো করে? সে বলে ১০টাকা। কথা হলো সে বাদাম ক্রেতার সাথে। কেন এত রাতেও বাদাম কেনা? তিনি বললেন, বিভাগের ছোটভাইদের সঙ্গে আড্ডা চলছে। আর আড্ডার মাঝে একটু বাদাম থাকলে মন্দ হয় না। তাছাড়া এত রাতে একটি ছোট্ট শিশু ফেরি করে বাদাম বিক্রি করছে বিষয়টি আমাকে নাড়া দিয়েছে। তাই তার মুখে এক চিলতে হাসি ফোঁটানোর উদ্দেশ্যেই এত রাতে বাদাম কেনা।
পরক্ষণে কথা হয় শুভর মায়ের সাথে। বলেন, অভাবের সংসার, বাচ্চাগো লয়ে খুব কষ্ট। ওর (শুভর) বাবা ছয় মাস থুঁয়ে চলে গেছে। অনেক দেনা আর ঋণ। ঋণ শোধ করার লাইগ্যা এতো কষ্ট। বাদাম বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, বিকেল পাঁচ টায় রেব হই। রাত দশটা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের ইবলিশ চত্বর, টুকিটাকি চত্বর, শহীদ মিনার ও সব জায়গায় বাদাম বিক্রি করি এ ছোট ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে। রেলগেট বাজার থেকে কাঁচা বাদাম কিনে আনি। বাড়িতে ভেঁজে ওজন করে প্যাকেট করে এমনে বিক্রি করি। তাছাড়া আর কি করমু? বাচ্চাগো লয়ে বাঁচতে তো হবে। তিনি আরো বলেন, রমজান মাসে দিনে বাদাম বিক্রি করা যায় না । তাই দিনে এখন ক্যাম্পাসের ভেতরে মেসওয়াক বিক্রি করি।
কেন ওর (শুভর) সঙ্গে থাকতে হয়? সে মা বলেন, ছোট ছেলে। ভালোভাবে ট্যাহা পয়সা রাখতে পারে না। দিন শেষে যেটুকু আয় হয় তা দিয়েই চলে সংসার। অনেকেই বাদাম কেনে। আবার অনেকে মায়া করে ছোট মানুষ বলে বাদাম কিনে।
তিন সন্তানের এই জননীর কথা বলতে বলতে কন্ঠটা ভারী হয়ে এলো। চোখের কোণে জলের কণা ছলছল করছে। তিনি বলেন, আমার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। শুশুরবাড়ি রাজশাহী জেলার নওদাপাড়ার আমচত্বর। জায়গার অভাব আর ট্যাহা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বিনোদপুর বস্তিতে থাকি। তিনি বলেন বাবা মা বিয়ের যৌতুকের ট্যাহা দিতে পারে নাই বলেই তিনি থুয়ে চলে গেছেন।
শুধু শুভই না এই ক্যাম্পাসে এমন অনেক শুভ রয়েছে। যাদের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সর্বত্রই দেখা মিলে। এভাবেই অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে উঠছে সম্ভাবনাময় এরকম হাজারো শুভর জীবন। কথার ফাঁকে এ মা বলেন আমিও চাই আমার পোলাপাইন স্কুলে যাক। ভালা পরিবেশে বেড়ে উঠুক। সেই সাথে তিনি আকুতি জানান তার পোলাপাইনের প্রতি সমাজের বিত্তবান মানুষগুলি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
সানবিডি/ঢাকা/আহো






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













