হুমকির কথা আমাদের জানাই ছিল

প্রকাশ: ২০১৬-০৭-০৩ ২০:৩৪:৩৯


গুলশানযেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়—বহু পুরোনো এক প্রবচন। ঢাকায় এ রকম কিছু যে আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে, সেটি কখনোই আমাদের কল্পনায় ছিল না। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, যাঁরা আমাদের নিরাপত্তারক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁরাও তা ভাবেননি। ফলে শুক্রবার রাতে দুঃস্বপ্নই সত্য হলো।

দেশের সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী আঘাতটি এল ঢাকার কথিত সবচেয়ে নিরাপদ এলাকাগুলোর একটি—কূটনৈতিক পাড়া, গুলশানে। হামলার লক্ষ্যস্থল একটি রেস্তোরাঁ, যেটি বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয়। হামলাকারীরা যে ইসলামি জঙ্গি কোনো গোষ্ঠী তা স্পষ্ট হয়, প্রায় ১৩ ঘণ্টার জিম্মি নাটকের শুরুতেই। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের স্মারকচিহ্ন অথবা আলামতগুলোর সবই ছিল এই হামলায়। সশস্ত্র এসব জঙ্গি ছিল বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। লক্ষ্য নির্বাচন, প্রস্তুতির ধরন এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে চমকে দেওয়ার উপাদানগুলো সেটাই প্রমাণ করে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা জঙ্গিদের এই কৌশলকে ‘চমকে দেওয়ার উপাদান’ বা এলিমেন্ট অব সারপ্রাইজ বলে অভিহিত করে থাকেন।

বাংলাদেশে এই সর্বসাম্প্রতিক হামলা আমাদের চমকে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে তা ততটা চমক হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে। কেননা বিদেশিরা, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা, অনেক দিন ধরেই হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন যে বাংলাদেশের নিম্নমাত্রার সন্ত্রাসী হামলা এবং সামাজিক অস্থিরতা জঙ্গিবাদ বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

হামলার ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই বিশ্বে নৃশংসতার জন্য সবচেয়ে নিন্দিত ইসলামি জঙ্গি সংগঠন, ইসলামিক স্টেট বা আইএস সাম্প্রতিক অন্য হামলাগুলোর মতোই এটিরও দায়িত্ব স্বীকার করে বিবৃতি দেয়। তবে গত প্রায় কুড়ি মাসে বাংলাদেশে যে ডজন কয়েক জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর থেকে এবারের হামলার দায় স্বীকারে কিছুটা পার্থক্য লক্ষণীয়। এবার, আইএস এর বার্তা সংস্থা হিসেবে পরিচিত, ‘আমাক’ একাধিকবার জিম্মি পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য ও ছবি প্রকাশ করেছে। অবশ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেছেন, নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিদেশিদের জিম্মি করার নজির থাকলেও বিদেশে পরিচালিত হামলায় কাউকে জিম্মি করার ঘটনায় আইএসের দায় স্বীকারের এটিই প্রথম ঘটনা। সে কারণে অনেকে শুরুতে এই হামলায় আইএসের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও জিম্মি-সংকট চলার সময়ে হত্যা করা পণবন্দীদের ছবি প্রকাশের পর তাঁরাও লাজওয়াব।

আপাতদৃশ্যে এবারের হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন বিদেশিরা এবং নিষ্ঠুর পরিহাসের বিষয় হলো, বাংলাদেশে আইএস প্রথম যে হামলাটির দায় স্বীকার করেছিল সেটিরও লক্ষ্য ছিলেন একজন বিদেশি। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, বিদেশিদের ওপর হামলা বৈশ্বিক সংবাদ শিরোনামে সহজেই স্থান পায়। ইতালীয় উন্নয়নকর্মী সিজার তাবেলার হত্যাকাণ্ডটিও ঘটেছিল এবারের হামলা গুলশানের যে ৭৯ নম্বর সড়কে হয়েছে তা থেকে মাত্র ১১টি সড়ক দূরে, ৯০ নম্বরে। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিজার তাবেলার পর দ্বিতীয় বিদেশির ওপর হামলা হয় মাত্র দুদিনের ব্যবধানে উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরে জাপানি কৃষিখামারি, কুনিও হোশির ওপর। সেই থেকে গত ২০ মাসে জঙ্গিদের হামলার শিকার হয়েছেন অপেক্ষাকৃত সাধারণ নিরীহগোছের মানুষ। যাঁদের ওপর হামলা হয়েছে তাঁরা ছিলেন ভিন্নধর্মাবলম্বী—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং ইসলামের শিয়া ও আহমদিয়া ধারার আধ্যাত্মিক নেতা বা অনুসারী। তালিকায় আরও ছিলেন ধর্মে বিশ্বাস নেই এমন লেখক, যাঁরা ব্লগার নামেই অধিক পরিচিত, প্রকাশক ও শিক্ষাবিদ।

এই দুই হামলার মধ্যে আরও যেসব মোটা দাগের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে তা হলো হামলার ধরন এবং হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রে। বাছাই করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হামলার ধরন অনেকটা গুপ্তহত্যার, যাতে প্রধানত ব্যবহৃত হয়েছে কোপানোর ধারালো অস্ত্র। আর গুলশানে হামলাটি হয়েছে অনেকটা খোলামেলাই এবং জিম্মিদের হত্যায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহৃত হলেও তারা ব্যবহার করেছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। অভিযান শেষে সামরিক বাহিনীর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, পিস্তল, একে ২২ রাইফেল এবং ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বহন করেছে এসব হামলাকারী।

বৈশ্বিক পরিসরে ইসলামি জঙ্গিবাদের বিস্তারের জন্য প্রধানত দুটো সংগঠনকে দায়ী করা হয়। এরা হলো আল-কায়েদা এবং আইএস। আল-কায়েদার কার্যক্রম আমাদের অঞ্চলে সমন্বয় করে থাকে আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি ও হত্যাকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে এই দুটো গোষ্ঠীই বিভিন্ন সময়ে তাদের ‘যোদ্ধা’দের অংশগ্রহণের কথা বলে এসেছে। তবে লক্ষণীয়ভাবে ব্লগার, প্রকাশক এবং সমকামী অধিকারকর্মীদের ওপর হামলাগুলোর বিষয়ে আইএস কখনো তাদের সংশ্লিষ্টতা দাবি করেনি।

গুলশানের এই সর্বসাম্প্রতিক হামলাটির বিষয়ে আইএসের দায় স্বীকারের পর নিয়মিত বিরতিতে আপডেট প্রদানের বিষয়টিতে ইঙ্গিত মেলে যে হামলার ঘটনাস্থল থেকে তারা সার্বক্ষণিক তথ্য পাচ্ছিল। তারা নিহত হিসেবে যাদের ছবি প্রকাশ করেছে, সেগুলো স্থানীয়ভাবে অন্য কোনো সূত্র থেকে প্রকাশিত হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রে আমরা জানি যে জিম্মি অবস্থা নিরসনে রক্তক্ষয় কমানোর জন্য উদ্ধার অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি হিসেবে ওই এলাকায় মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু এর মধ্যেও আমাকের কাছে হামলাকারী জঙ্গিদের নৃশংসতার ছবি এবং প্রায় তাৎক্ষণিক (লাইভ) তথ্য প্রেরণ কীভাবে সম্ভব হয়েছে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

হামলার খবর পাওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনীর যাঁরা প্রথম সাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা স্পষ্টতই ঘটনা কতটা গুরুতর ও ভয়াবহ তা অনুমান করতে পারেননি। কোনো ধরনের আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার প্রশ্নও তাই অর্থহীন। তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে গিয়ে যেসব পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য সেখানে গেছেন তাঁদের ওপর যেভাবে বেধড়ক গুলি ও বিস্ফোরক (বোমা অথবা গ্রেনেড কি না তার কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি) ছোড়া হয়েছে তা থেকে বোঝা যায়, জঙ্গিরা আটঘাট বেঁধেই হামলা চালায়। এমনকি রেস্তোরাঁটির ভেতরে আগে থেকেই কেউ অস্ত্র মজুত করেছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে বাধ্য। দুঃখজনকভাবে, এই প্রাথমিক ধাক্কাতেই দুজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্তা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৫ জন।

এ কথা ঠিক যে উন্নত ও আধুনিকতম প্রযুক্তিনির্ভর পশ্চিমা দেশগুলোতেও সন্ত্রাসবাদী হামলা হচ্ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে। বিশ্বের কোনো অংশকেই এখন আর নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। সিডনির ক্যাফেতে যে হামলাকারী অফিসকর্মীদের জিম্মি করে হত্যা করেছিল, তার অনুপ্রেরণা ছিল আইএস। ব্রাসেলস ও প্যারিসের হামলাগুলোতেও ওই একই অনুপ্রেরণা। ইস্তান্বুলের বিমানবন্দরে হামলার জন্য সবাই আইএসকে সন্দেহ করলেও তারা এখন পর্যন্ত তার দায় স্বীকার করেনি। কিন্তু বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংঘটিত তিনটি হামলার (গুলশানের রেস্তোরাঁয় হামলা ছাড়াও ঝিনাইদহে সেবায়েত, বান্দরবানে একজন বৌদ্ধধর্মবিশ্বাসীকে হত্যা) প্রতিটিরই দায়িত্ব দাবি করেছে তারা। এগুলোর সবই আমাদের যেমন উদ্বিগ্ন করে, তেমনি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের নাগরিকদেরও তা উদ্বিগ্ন করবে। বিশ্বে এখন শান্তি ও প্রগতির শত্রু কে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন বলা হচ্ছে রাষ্ট্রশক্তির চেয়েও বড় হুমকি বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক কোনো দল, গোষ্ঠী বা চেতনাগত জোট, যাদের নন-স্টেট অ্যাক্টর হিসেবে অভিহিত করা হয়। আদর্শগত ভ্রান্তির তাড়নায় এসব নন-স্টেট অ্যাক্টর হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে।

হুমকির কথা আমাদের জানাই ছিল। বিদেশিরাও এ রকম শঙ্কার কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু যখন সেই সন্ত্রাস আঘাত হানল তখন তার নিষ্ঠুরতায় আমরা অনেকটাই হতবাক। জঙ্গি সন্ত্রাসীদের ধর্মের নামে নিষ্ঠুর বর্বরতায় আমরা ক্ষুব্ধ। এতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণহানিতে আমরা শোকাহত। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি দেশের ভেতরে ও বাইরে আস্থা ফিরিয়ে আনা। কাজটি সহজ না হলেও এর কোনো বিকল্প নেই।   সূত্র: প্রথম আলো

সানবিডি/ঢাকা/আহো