ওরা ৪ নারী জঙ্গি!

আপডেট: ২০১৬-০৮-১৭ ১৮:৩০:১০


untitled-5চিকিৎসক মা-বাবার আদরের সন্তান ইসতিনা আক্তার ঐশী নিজেও চিকিৎসক। গত জানুয়ারিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস পাস করে মাস দুয়েক আগে একই হাসপাতালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন তিনি। র‌্যাবের দাবি, মেধাবী এই তরুণী নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সক্রিয় সদস্য। সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন ‘জঙ্গিবাদে’।

গত সোমবার ভোরে র‌্যাব-৪-এর একটি দল রাজধানীর মগবাজারের বাসা থেকে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঐশীকে আটক করে। একই অভিযোগে গাজীপুর ও মিরপুর এলাকা থেকে আকলিমা রহমান মনি, ইশরাত জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ ও খাদিজা পারভীন মেঘনা নামের আরও তিন তরুণীকে আটক করা হয়। তারা মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত। আটক চারজনেরই বয়স ২৩ বছরের মধ্যে। র‌্যাব বলছে, ওই চার তরুণী জেএমবির ‘নতুন ধারার’ নারী দলের সক্রিয় সদস্য। তাদের মধ্যে আকলিমা জেএমবির নারী ইউনিটের উপদেষ্টা। তবে স্বজনরা বলছেন, তাদের সন্তান জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে এটা তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জঙ্গি গ্রুপে দলভুক্ত করার তথ্য পাওয়া যায়। এবারই প্রথম একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও তিন ছাত্রীকে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে

একসঙ্গে আটক করা হলো। অবশ্য শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ঐশীর বাবা বিশ্বাস আক্তারের দাবি, ‘তার মেয়ে জেএমবি বা জঙ্গি নয়। সে ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক। জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদকে পারিবারিকভাবেই তার মেয়ে ঘৃণা করে।’

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরে র‌্যাব-৪-এর কার্যালয়ে ওই চার তরুণীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। সেখানে র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার লুৎফুল কবির বলেন, গত ২১ জুলাই জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলীয় আমির মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসানকে টঙ্গী থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে কয়েকজন নারীর জেএমবিতে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। অনুসন্ধান চালিয়ে তারা জানতে পারেন, আকলিমা রহমান নামের জেএমবির এক নারী সদস্য গত রমজান মাসে ১২ হাজার টাকার তহবিল সংগ্রহ করে দিয়েছেন। অতঃপর তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে নেওয়া হয়। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আকলিমাকে গাজীপুরের সাইনবোর্ড এলাকায় নিজ বাসা থেকে আটক করা হয়। ১২ হাজার টাকার তহবিলের মধ্যে আট হাজার টাকার জোগান দেন ঐশী। মৌ ও মেঘনা তাদের সহযোগী।

লুৎফুল কবির বলেন, আকলিমা দেড় বছর ধরে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কথিত ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলকে বড় করা এবং তিনি তহবিল সংগ্রহ করে মাহমুদুল হাসানকে পেঁৗছে দিতেন। জেএমবির নারী গ্রুপটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আকলিমা ও ঐশীর কাছ থেকে আসত।

র‌্যাব কর্মকর্তাদের দাবি, আকলিমার মোবাইল ফোন থেকে জঙ্গি কর্মকান্ড অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি নারী গ্রুপের সদস্য বাড়াতে বাইয়াত ও দাওয়াত কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন।

অভিযানের বিষয় জানিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, আকলিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা মৌর নাম জানতে পারেন। তিনি সাত মাস ধরে জঙ্গিদের নারী দলে যুক্ত। পরে তাকে মিরপুর-১-এর জনতা হাউজিংয়ের বাসা থেকে আটক করা হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন। তবে তার ল্যাপটপে জিহাদি কর্মকান্ড দলিল ও বাসায় উগ্র মতবাদের বই পাওয়া গেছে। এরপরই একই এলাকার একটি মেস বাসা থেকে মেঘনাকে আটক করা হয়।

র‌্যাব সূত্র জানায়, আকলিমা রহমান ২০১০ সালে উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ২০১২ সালে হলি চাইল্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৩ সালে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মাসি বিভাগে ভর্তি হন এ তরুণী। বর্তমানে ওই বিভাগে তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের উত্তর খাইলকুরে। বছরখানেক আগে আনসার আলী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচয় হয় মাহমুদুল হাসান নামের এক ‘বড় ভাই’য়ের সঙ্গে। মাহমুদুল তাকে তাবলিগ, জামায়াতে ইসলামী, আহলে হাদিস, হিযবুত তাহ্রীর, আইএস সম্পর্কে ধারণা দেন। তাকে কথিত ‘আইএস’-এ দলভুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেওয়া হয়। আকলিমা জামায়াতের ছাত্রী সংস্থায় যোগ দেন। মাহমুদুলের ফেসবুক আইডি থেকে তিনি ‘আল সাবি্বর খান জাবিলের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি মাহমুদুল হাসানের মাধ্যমে জেএমবির নারী দলে প্রবেশ করে গ্রুপটির উপদেষ্টাও হন।

আটক মৌ মিরপুর-২-এর ইসলামিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি ও মিরপুর বিসিআইসি কলেজ থেকে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন। মেডিকেল ও ইউনিভার্সিটি ভর্তির জন্য তিনি ইউসিসির ফার্মগেট শাখায় কোচিং করেন। পরে ২০১৩ সালে ভর্তি হন মানারাত ইউনিভার্সিটির ফার্মাসি বিভাগে। মৌর বাবা হাবিবুর রহমান। তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলের বিলবিলাসে। বর্তমানে তারা মিরপুরে জনতা হাউজিংয়ে থাকেন। সৌদিপ্রবাসী আবদুল আজিজ ও জিয়াউর রহমান নামের দুই ব্যক্তির কাছে আরবি ভাষা শিখেছেন মৌ। ‘আত-তামকিন’ লিংকের মাধ্যমে তিনি কথিত আইএসের খিলাফত-সংক্রান্ত বয়ান শুনতেন। ‘উম্মু জনদুল্লাহ হুরাইয়া’র মাধ্যমে থ্রিমা অ্যাপ ও একিউআইএস সম্পর্কে জানেন।

মেঘনা ঢাকার আহম্মদনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি ও ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। ওই বছরই তার বিয়ে হয়। তিনিও আকলিমা ও মৌর সঙ্গে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। তার বাবার নাম খোরশেদ আলম। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। মেঘনার গ্রামের বাড়ি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে। ‘ব্লাড রোজ’ নামে একটি গ্রুপের মাধ্যমে মেঘনা, আকলিমা, শহিদুল্লাহ, মৌ ও তাদের কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব ‘নবুওয়াতের আদলে খিলাফত’ ও একজন খলিফা কীভাবে মুসলিম উম্মাহ শাসন করবে_ এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করতেন।

ঐশী ২০১০ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। চলতি বছর জানুয়ারিতে এমবিবিএস শেষ করে জুন মাসে তিনি ইন্টার্নশিপ শুরু করেন। ঐশীর বাবা বিশ্বাস আক্তার হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। তার মা ডা. নাসিমা সুলতানা একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক। ঐশীর চাচা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ২০১৩ সালে তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারেন, ধানমণ্ডিতে একটি বাসায় ‘ইসলামী ক্লাস’ হয়। তিনি ওই ক্লাসে যেতেন। সেখানে ক্লাস নিতেন পাকিস্তানের নাগরিক শাহপুর নামের এক নারী। তার পাশাপাশি আমিনা নামের এক বাংলাদেশি নারীও ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তরুণীদের মগজধোলাই করতেন। ‘ইসলামী ক্লাস ফর গার্লস পেজ’ নামে তাদের একটি গ্রুপ রয়েছে। র‌্যাবের দাবি, ঐশীর ল্যাপটপ থেকে জঙ্গি-সংক্রান্ত ফাইল, ম্যাগাজিন ও লেকচার ভিডিওসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে।

ঐশীর বাবা বিশ্বাস আক্তার হোসেন দাবি করেন, তার মেয়ে জঙ্গি নয়, তবে ধার্মিক। তারা পারিবারিকভাবেই জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিবাদ ঘৃণা করেন। ফেসবুকের মাধ্যমে ঐশী কয়েকজনের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়ে যোগাযোগ করত। তার মেয়ে ঘটনার শিকারমাত্র।

সানবিডি/ঢাকা/এসএস