বিএসইসির কার্যক্রমে নেই দৃশ্যমান উন্নতি, হতাশায় ডুবছে পুঁজিবাজার
আপডেট: ২০২৫-০৪-২১ ১১:১২:৩৬
চরম হতাশা, অস্থিরতা ও আস্থাহীনতায় অতল গহ্বরে দেশের পুঁজিবাজার। বছরের পর বছর ধরে যে আস্থাহীনতা বিরাজ করছে, তার উন্নতি তো দূরের কথা বরং চরম হতাশায় নিমজ্জিত দেশের অর্থনীতির এই গুরত্বপূর্ণ খাত। গত সপ্তাহেও ঢালাও পতনের মধ্য দিয়ে গেছে শেয়ারবাজার। লেনদেন ছিলো চারশো কোটির ঘরে। এতে একে একে পুঁজি হারিয়ে নিঃশেষ হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
৫ আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর একে একে পদত্যাগ করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা। অন্তবর্তী সরকার দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর ১৩ আগস্ট বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ তুলে তার নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন মহল। পরে তিনি নিজেই যোগদানে অপরাগতা জানালে ১৮ আগস্ট নিয়োগ দেয়া হয় সাবেক ব্যাংকার খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে। দ্বায়িত্ব নিয়েই পুঁজিবাজারের সুশাসন নিশ্চিত করা ও আস্থা ফেরানো তার প্রথম কাজ বলে জানান তিনি।
বিএসইসির নেতৃত্বে পরিবর্তনের ফলে অন্যান্য সকল জায়গার মতো পুঁজিবাজারেও আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে সংস্কারের ছোঁয়া লাগলেও পুঁজিবাজারে নেই দৃশ্যমান উন্নতি। বেশ কয়েকটি কোম্পানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় কমিশন। কিন্তু জরিমানার মধ্যেই সীমিত থাকে এই পদক্ষেপ। পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স ৩টি বিষয়ে সুপারিশ দিলেও সংস্কার কার্যক্রম কবে নাগাদ শেষ হবে তাও নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি কমিশন।
গতবছরের ৫ আগস্টের পর কার্যত অভিভাবকহীন ছিল বিএসইসি। এসময়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল বাজার। ঢাকার পুঁজিবাজারে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় ৮০০ পয়েন্ট বেড়ে ৬০০ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। লেনদেনও বেড়ে ২ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছিল।
কিন্তু গত বছরের ১৯ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদ যোগদানের পর থেকে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৭৭৫ পয়েন্ট থেকে প্রায় ৭০০ পয়েন্ট কমে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত তা দাঁড়িয়েছে ৫০৭৪ পয়েন্টে। লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা থেকে নেমে আসে চারশো কোটিতে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে সব জায়াগায় সংস্কার হলেও পুঁজিবাজারে নেই সংস্কারের ছোঁয়া। সংস্কারের ফলে ইতোমধ্যেই দেশের ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাজারের বেহাল দশায় নেই দৃশ্যমান উন্নতি। বরং গত আট মাসে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। আইপিও আসাও একেবারেই বন্ধ।
পুঁজিবাজারের এমন অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় পড়েছে বিএসইসির বর্তমান কমিশন। এরই মধ্যে নতুন করে বিএসইসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আস্থাহীনতায় পড়েছেন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। গত ৪ মার্চ নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে সৃষ্টি হয় অস্থিরতা। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে বিএসইসিতে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এঘটনার পর ৬ মার্চ বিএসইসি চেয়ারম্যানের গানম্যান মো. আশিকুর রহমান ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে ৯ মার্চ কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে যোগদান করেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা। এঘটনার পর থেকে অজানা আতঙ্ক নিয়ে অফিস করছেন কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
এরই মধ্যে ১৫ এপ্রিল বিএসইসির প্রশাসন বিভাগের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাবিদ ইমতিয়াজ আলী সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তথ্য চেয়ে ইমেইল করছেন। এতে বিএসইসির কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন আতঙ্ক। কর্মকর্তা কর্মচারিদের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে নতুন করে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দিতে তৈরি হচ্ছে তালিকা।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বরাবর প্রতিবেদন দিয়েছেন চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ। নিজ কর্মীদের উপর ভরসা করতে পারছে না বর্তমান কমিশন। ফলে ভেতরে ভেতরে বিএসইসিতে একধরণের অচলাবস্থাই বিরাজ করছে।
এমতাবস্থায় ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশনের (ডিবিএ) নেতারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জরিমানা ছাড়া আর কোন উন্নতি নাই। সত্যিকার অর্থে বিএসইসিতে কোন কাজ হচ্ছে না।
বাজারে বিনিযোগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। বড় পুঁজির বিনিয়োগ না হলে কখনই পুঁজিবাজার রান করবে না। বিএসইসিতে গত ৮ মাসে কোনো আইপিও পেন্ডিং নাই। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা নাই। এই বাজারে পণ্য সরবরাহ খুবই বাজে।
টাস্কফোর্স নিয়ে ডিবিএ নেতারা বলছেন, যাদের নিয়ে এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, তারা বাস্তবে প্রকৃত অর্থে অভিজ্ঞতাহীন। এরা আবার করেছে ফোকাস গ্রুপ। যারা ব্রোকার কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই মতামত দিয়েছে। অথচ তাদের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
২০১০ সালের পর থেকেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর মাঝে বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। শেয়ারবাজারে দরপতনের ফলে বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দ্রুত সময়ে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার সাধন করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এসকেএস






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













