আন্দোলনে স্থবির এনবিআর, রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতির শঙ্কা
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-০৫-২২ ১১:৪৫:৫৪
রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে: সিপিডি
তড়িঘড়ি করে এনবিআর সংস্কার শুরু করায় হিতে বিপরীত হয়েছে: তারেক রহমান
এনবিআরকে যেভাবে ভাগ করা হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ ধরনের কর্মবিরতিতে যাওয়া উচিৎ হয়নি: আইসিবি চেয়ারম্যান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্তির সিদ্ধান্তের চলমান আন্দোলনে অচলাবস্থা রাজস্ব প্রশাসনে। ফলে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মূল চালিকাশক্তি এই সংস্থাটির কার্যক্রম স্থবির।
সাধারণত অর্থবছরের শেষ সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় বাড়ে। এবারে তার ব্যতিক্রম। গত অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব কমেছে। এনবিআরের চলমান আন্দোলন ঘিরে রাজস্ব আদায়প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ হিসাবেও এ ঘাটতির প্রভাব পড়বে।
গত ১২ মে জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ দুটি নতুন বিভাগ করেছে সরকার। এর আগে গত ১৭ এপ্রিল উপদেষ্টা পরিষদে খসড়া অনুমোদনের ২৫ দিন পর এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এনবিআরের অধীনস্থ কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে নেমেছেন। ১৪ মে থেকে কলম বিরতি শুরু করে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই পরিস্থিতিতে ২০ মে (মঙ্গলবার) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ৷ অর্থ উপদেষ্টার পক্ষ থেকে বৈঠক সন্তোষজনক বলা হলেও এনবিআর কর্মকর্তারা দাবি করেন, বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি।
রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজস্ব প্রশাসনে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো, যাতে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম স্বাভাবিক হয় এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তা না হলে দেশ হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বে।
অসহযোগ কর্মসূচির ডাক
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্তির অধ্যাদেশ বাতিল ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানকে অপসারণসহ চার দাবিতে অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
গতকাল (বুধবার) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শুরু থেকেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে আমাদের এই নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির ব্যাপকতা ও যৌক্তিকতার বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঠিক তথ্য প্রদান না করে বরং প্রকৃত তথ্য আড়াল করেছেন। যা পরিস্থিতিকে আজকের অবস্থানে উপনীত করেছে।
এ অবস্থায় আমাদের বর্তমান দাবিগুলো হচ্ছে– জারি করা অধ্যাদেশ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে, অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করতে হবে, রাজস্ব সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশ জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাবিত খসড়া এবং পরামর্শক কমিটির সুপারিশ আলোচনা-পর্যালোচনাপূর্বক প্রত্যাশী সংস্থাগুলো, ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত নিয়ে উপযুক্ত ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মসূচির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আজ বৃহস্পতিবার (২২ মে) দুপুরে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের দাবিগুলোর বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া করা হবে। পাশাপাশি এনবিআর এবং ঢাকা ও ঢাকার বাইরে স্ব স্ব দপ্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা এর আওতামুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া আগামী ২৪ মে এবং ২৫ মে কাস্টমস হাউস এবং এলসি স্টেশনগুলো ব্যতীত ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি চলবে।
এ দুইদিন কাস্টমস হাউস এবং এলসি স্টেশনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। তবে রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা কর্মবিরতির আওতামুক্ত থাকবে। আর আগামী ২৬ মে থেকে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা ব্যতীত ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি চলবে।
রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর শঙ্কা
কর্মবিরতির ফলে আয়কর রিটার্ন প্রক্রিয়া, কাস্টমস ছাড়পত্র ও ভ্যাট আদায়ে বিলম্ব হচ্ছে। এতে করে রাজস্ব আদায়ের ওপর বিদ্যমান চাপ আরও বেড়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই–ডিসেম্বর) এনবিআর গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৭ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে, যা ২৫ শতাংশ ঘাটতি। এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ১৫১ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মার্চ মাস পর্যন্তই রাজস্ব ঘটতি হয়েছে ৬৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
এই ঘাটতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা, আমদানির হ্রাস ও কর ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এনবিআর কর্মকর্তাদের চলমান কর্মবিরতি রাজস্ব আদায় আরও ব্যাহত করছে, যার ফলে ঘাটতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পূর্বাভাস দিয়েছে, রাজস্ব আদায়ের এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে ব্যয় সংকোচন করতে হতে পারে কিংবা বাড়াতে হতে পারে ঋণগ্রহণের পরিমাণ, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাজনীতি,অর্থনীতি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এনবিআর সংস্কার নিয়ে তেমন কোনো দ্বিমত নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা না করে তড়িঘড়ি করে সংস্কার শুরু করায় হিতে বিপরীত হয়েছে। নিয়মিত রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে চলতি বছরের হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দুই ভাগ করাটা ঠিক হয়েছে। এটা আমাদের শ্বেতপত্রের সুপারিশেও ছিল। কিন্তু যেভাবে করা হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আলোচনা ব্যতিরেকে, পেশাজীবীদের জায়গা সংকুচিত ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে করা হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। এটাকে এখন ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পরিচালক ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে অবশ্যই রাজস্ব আদায়ে বিঘ্ন ঘটছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ ধরনের কর্মবিরতিতে যাওয়া উচিৎ হয়নি।
এই কর্মবিরতির ফলে সৃষ্ট ক্ষতি পরবর্তীতে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ‘এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই’ বলে জানান তিনি।
গত মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাপারে যে ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছিল, তা দূর হয়েছে। এনবিআরকে যে দুই বিভাগে ভাগ করা হয়েছে, তা–ই থাকবে। তবে তাদের দাবি দাওয়া পুরণের বিষয়ে আমরা দেখবো।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














