নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ ও তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-০৭-০৩ ১১:৩৭:০৫
# জুলাই মাসের মধ্যে জুলাই সনদ তৈরির আশা ঐকমত্য কমিশনের
#বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে
#ঐক্যমত কমিশনে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর রূপরেখা দিয়েছে এনসিপি
#তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন চায় জামায়াত
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় ধাপের অষ্টম দিনের আলোচনায় নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কিত বিধান সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। তবে নির্বাচনী এলাকা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হলেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন সম্পর্কিত বিধান সম্পর্কে আলোচনা শেষ করা যায়নি। এদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা থাকলে জুলাই মাসের মধ্যে জুলাই সনদ তৈরির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে দ্বিতীয় ধাপের অষ্টম দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে শেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দেওয়া বক্তব্যে এ তথ্য উঠে আসে।
বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য হয়েছে।
তিনি বলেন, আজকে আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সীমান নির্ধারণ যে ঐক্যমত্য সৃষ্টি হয়েছে তা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, আশু ব্যবস্থা। কারণ নির্বাচন কমিশন থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নির্বাচনী আসন নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলমান দেখতে পাচ্ছি। এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশন থেকে সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিলো সেখানে বলা হয়ে আশু ব্যবস্থা হিসেবে কি করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় দীর্ঘমেয়াদী সাংবিধানিকভাবে কিছু করা। দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী সমাধানে যে ঐক্যমত হয়েছে তা হলো- প্রতি আদমশুমারি অনধিক ১০ বছর পরে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের জন্য সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদের দফা এক এর ঘ শেষে আইনের দ্বারা একটি বিধান যুক্ত করা। এর অর্থ হচ্ছে সংসদীয় আসন নির্ধারণ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্নমত পোষণ করে দিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐক্যমত্য আছে। এর গঠন এবং কাঠামোগত বিষয় ও সরকার কতদিন থাকবে তা নিয়ে আলোচনা করেছি। আলোচনায় বিভিন্ন রকম মতামত এসেছে। এ বিষয়ে দুটি সুপারিশ ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন থেকে ছিল ৯০ দিনের আর নির্বাচন কমিশন যে ছিল ১২০ দিনের। এই সমস্ত সময় ও পরিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ হবে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনা রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কাছাকাছি এসেছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যে আলোচনা হয়েছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক। তোমাদের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন যাবত আমরা সবাই অনেক সংগ্রাম করেছি। আমরা আশা করি এ সকল বিষয় নিয়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই মর্মে সহযোগিতা থাকলে চলতি জুলাই মাসের মধ্যে আমরা একটি জুলাই সনদ তৈরি করতে পারব।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদের ক্ষেত্রে বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে, তিনমাস বা ৯০ দিন। যদি কোন কারণে কোন কারণে বিলম্বিত হয়, আরো এক মাসের একটা বিধান রাখা যেতে পারে সংবিধানে। তবে স্থির থাকতে হবে তিনমাসে, এখানে আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি”।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে তো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নেই। নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার এর মধ্যে দুইটা জিনিস একটি হচ্ছে, জাতীয় নির্বাচন আরেকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেটা এখনো বহাল আছে। তাতে কোন সংশোধন আসেনি। প্রস্তাব তো যে কেউ দিতেই পারে।
বিএনপি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে জানিয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা তো অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি। অর্থবিল আর আস্থাভোট ছাড়া বাকি বিষয়ে পার্লামেন্ট সদস্যরা স্বাধীন থাকবেন এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে।
“বলা হয় বিএনপি কারণে সংস্কারে ঐকমত্য হচ্ছে” এমন মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জাতির সাথে একটা ঐক্যমতে আসার জন্য নিজ উদ্যোগে আমরা প্রধান মন্ত্রীর জীবদ্দশায় ১০ বছরে বেশি নয়, এ বিষয়ে একমত হয়েছি। যাতে আর কেউ স্বৈরাচার হয়ে না আসতে পারে। একটা ব্যালেন্স যাতে সরকার ব্যবস্থায় হয়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রতি আদমশুমারির পরে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে একটি সাংবিধানিক বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিষয়ে দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রসঙ্গে অধিকাংশ দল একমত হলেও জামায়াতের পক্ষে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দিতে হবে এবং এ সরকারের মেয়াদ ৪মাস হতে হবে।
ডা. তাহের বলেন, ‘সীমানা নির্ধারণের জন্য অনেকগুলো বিশেষজ্ঞের কাজ করতে হয়। জরিপের কাজ, ভৌগোলিক অঞ্চলকে সমন্বয়, ভোটের আনুপাতিক দিকগুলো আছে—এমন অনেক বিষয়ে। সবকিছু বিবেচনা করে এটি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি হবে।’
‘আর স্থায়ীভাবে আরেকটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছি, সংবিধানে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির বিষয়ে উল্লেখ থাকবে। আদমশুমারির পরপরই সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকবে। তারা একটি সাংবিধানিক কমিটি হিসেবে কাজ করবে, সংবিধানে তাদের কথা উল্লেখ থাকবে।’
এদিকে, ঐকমত্য কমিশনের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপ রেখা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি -( এনসিপি)। দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, বাংলাদেশে যখনই ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় হয়, তখন সরকার দল বিরোধী দল এবং অন্যান্য দলের মধ্যে একটা সংঘাত পূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়, ফলশ্রুতিতে আমরা দলের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এবং ঐকমত্য কমিশনের কাছে সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছি।
রূপ রেখা তুলে ধরে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য জাবেদ রাসিম বলেন, “ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেখানে বিচারালয়কে টেনে এনে বিচারালয়কে রাজনীতিকরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, আমরা এটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমেই এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। উচ্চ কক্ষ এবং নিম্ন কক্ষের একটি ১১ সদস্যের পার্লামেন্টারি অল পার্টি কমিটির মাধ্যমে তাদের মধ্য থেকে তিনজন করে নাম প্রস্তাব করবে যিনি প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন। ওই নাম গুলো পাবলিক হবে ওই খান থেকে যে পাশ করে যাবেন, ১১ জনের কমিটি থেকে ভোটের মধ যদি আট/তিন ভোটে পাশ করেন তিনি প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হবেন।
তিনি বলেন, কিন্তু এই পদ্ধতি ব্যর্থ হলে উচ্চ কক্ষে পিআর সিস্টেমে আমাদের উচ্চ কক্ষ গঠিত হলে র্যাংক চয়েজ ভোটের পদ্ধতিতে সেই নয়জন প্রার্থীর মধ্য থেকে একজন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারবো। আমরা একটা সিস্টেম ডেভেলপড করতে চাই, একটা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া আমরা ঠিক করতে চাই। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় যে যুদ্ধাবস্থা, গৃহযুদ্ধের মত অবস্থা সৃষ্টি হয় সেটা সেই অবস্থা যেন বিরাজ না করে সেই প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। তারা বিবেচনা করবে বলেছেন।
বৈঠকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ মোট ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান বিচারপতি এমদাদুল হক, দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, বিএনপি’র পক্ষে আরো ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। এবং অন্যান্য দল থেকে বৈঠকে অংশ নেন-মোস্তাফিজুর রহমান ইরান (লেবার পার্টি),ড. রেদওয়ান আহমেদ (এলডিপি), রুহিন হোসেন প্রিন্স (সিপিবি),ড. ফরিদউজ্জামান ফরহাদ (এনপিপি), শাহাদাত হোসেন সেলিম (বাংলাদেশ এলডিপি),শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু (ভাসানী জনশক্তি পার্টি), আরিফুল ইসলাম আদিব (এনসিপি), সৈয়দ এহসানুল হুদা (জাতীয় দল),
মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজি (ইসলামী ঐক্যজোট), মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ (জামায়াতে ইসলামী),
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ (এবি পার্টি),
গাজী আতাউর রহমান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), সাইফুল হক (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি), মোহাম্মদ সিরাজ মিয়া (জেএসডি), মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ), ড. আহমদ আব্দুল কাদের (খেলাফত মজলিস)।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














