প্রাইভেট সেক্টর ও সরকারের জন্য মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্র পুঁজিবাজার

আপডেট: ২০২৫-০৭-১৪ ২০:৩৬:২৫


বিনিয়োগের জন্য ও দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাজার। এটা শুধু প্রাইভেট সেক্টরের জন্যই নয় বরং সরকারের জন্যও। এই কনসেপ্টেই আমাদের পরিষ্কার নয়। সেইসাথে আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা হলো ফাইন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজারের মান। ফাইন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজারের মান এখনও পর্যন্ত কাঙ্খিত জায়গা থেকে অনেক দূরে আছে। পাশাপাশি অর্থনীতির সাথে ক্যাপিটাল মার্কেটের গভীরতা বৃদ্ধি না পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা।

সোমবার (১৪ জুলাই) ইকনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “ক্যাপিটাল মার্কেট পুনর্গঠন ও বাস্তবতা” শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ডিএসই’র চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, সিএসই’র চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান ও ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির ব্যক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগের জন্য ও দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাজার। এটা শুধু প্রাইভেট সেক্টরের জন্যই নয় সরকারের জন্যও। এই কনসেপ্টেই আমাদের পরিষ্কার নয়। সরকার যে পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে তার ব্যয় বহন করবে, সরকারের স্বায়ত্বসাশিত প্রতিষ্ঠানগুলো যে ব্যয় মেটাবে বিনিয়োগ, এই ধারণাতেই আমরা এখনও আসতে পারিনি।

ক্যাপিটাল মার্কেট পুনর্গঠনের আগে আমাদেরকে ক্যাপিটাল মার্কেটের ধারণা সংজ্ঞায়ন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

উন্নত বা অ্যাডভান্সড দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, এসব দেশের অনেকের জিডিপির থেকেও মার্কেট ক্যাপিটাল বেশি। এই ধারণাটাই বাংলাদেশের ক্যাপিট্যাল মার্কেটে অনুপস্থিত। তাই আগে আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেটের ধারণা পরিবর্তন করতে হবে তারপরে পুনর্গঠন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কমপ্লায়েন্স অব কস্ট হিসেব করছে। কিন্তু কম খরচে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পাচ্ছেন। সেটা তো হিসাব করছেন না। ব্যাংকের ব্যয় তো নির্ধারিত। কিন্তু পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে ব্যয় নির্ধারিত নয়। আপনি ট্যাক্স ডিফারেন্স হিসেব করবেন, কম্প্ল্যায়েন্স অব কস্ট হিসাব করবেন কিন্তু আপনারা যে লং টার্ম সোর্সি করছেন, একটা বড় এমাউন্ট পাচ্ছেন সেটা তো হিসেব করছেন না।

আমির খসরু আরও বলেন, আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন এর ইন্টারেস্ট ১২ পার্সেন্ট, এটা ১৫ পার্সেন্ট হতে পারে। এটার ওপর তো আপনার কোন কন্ট্রোল নেই। কিন্তু ক্যাপিট্যাল মার্কেটে আপনার ইনকামের ভিত্তিতে আপনি রিটার্ন দেবেন।

বিশেষ অতিথির ব্যক্তব্যে ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের দেশের পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা হলো ফাইন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজারের মান। ফাইন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজারের মান এখনও পর্যন্ত কাঙ্খিত জায়গা থেকে অনেক দূরে আছে। সেখানে আন্ডাররাইটিং অফ ক্যাপিটাল মার্কেট, ট্যাক্স কালেকশন সবগুলোই খুব চ্যালেঞ্জিং।

তিনি আরও বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেটের ক্ষেত্রে স্টেটমেন্টের রিস্টেট করার দরকার সেখানে ট্যাক্স অনেক বেড়ে যায়। যার ফলে তাঁরা ক্যাপিটাল মার্কেটে আসতে চায় না। কমপ্লায়েন্স অনেক বেশি করতে হয়। সেটার জন্য অনেকে আসতে চান না। এটা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য অনেক বড় ঝুঁকি।

মমিনুল ইসলাম বলেন, ফাইন্যান্সিয়াল স্টেমেন্টগুলোকে যদি মানুষের কাছে উন্মুক্ত করা হয় স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। যাতে অমাদের সাধারণ মানুষ, বিশ্লেষক এবং সাংবাদিকরা যদি দেখতে পারে সেখান থেকে একটা ভালো ফলাফল আসতে পারে।

নিরীক্ষক ও ইস্যু ম্যানেজারদের দায় নিতে হবে উল্লেখ করে ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, নিরীক্ষকরা যদিও চাচ্ছেন না যদি আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি থাকে তাহলে তাদেরকে দ্বায়বদ্ধ করা, কিন্তু সেটা করতে হবে। ইস্যু ম্যানেজারদেরকেও দায় নিতে হবে।

সিএসই’র চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের ইকনোমিক গ্রোথ যেমন আছে সেটার সাথে পাল্লা দিয়ে পুঁজিবাজারের মার্কেট ক্যাপিটাল সেইভাবে বৃদ্ধি পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন টু জিডিপি রেশিও কখনোই ৩০ শতাংশের ওপরে যায়নি। ২০১০ সালে বা তারও আগে ৩০ এর কাছাকাছি গিয়েছিল, যেটা কমতে কমতে এখন ১০ বা ১২ এর মধ্যে ওঠানামা করে।

তিনি বলেন, আমাদের নিকটবর্তী দেশ যেগুলো আছে ভিয়েতনাম বা মালেশিয়ার দিকে যদি দেখি, তাদের জিডিপির সাথে মার্কেট রেশিও প্রায় ছয় সাত গুন বেশি। অর্থনীতির সাথে ক্যাপিটাল মার্কেটের যে গভীরতা বৃদ্ধি পায়নি এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। বরং নানা করনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়েছে। যে কারনে সিডিবিএল এর তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে ১৪ লাখ বিও হিসাবধারী বিনিয়োগকারী বাজার থেকে চলে গেছে।

ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, স্টক মার্কেট বা শেয়ার মার্কেট বলতে যা বুঝাচ্ছি সেটা আর বাংলাদেশে নাই, গত ১৭ বছরে এটা ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিদেশী বিনিয়োগের পূর্বশর্ত গণতন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আসার জন্য প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্র ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ফান্ড ম্যানেজারদেরকে ম্যান্ডেটই দিচ্ছে না। এজন্য গত ১৫ বছরে আমরা বিদেশী বিনিয়োগ হারিয়েছি।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, পরের বছর থেকে একটা উন্নতি দেখতে পারব। আমি দেখতে পারছি যে, পরের বছরের মধ্যে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম হবে। সামনের নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার আসলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে।

কর্মশালায় ইআরএফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মানিক মুনতাসিরের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন, ডিএসই’র পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি গোলাম সামদানি ভুঁইয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।

এম জি