‘সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ’শীর্ষক আলোচনা ড. জাহিদ হোসেন

চলতি অর্থবছরে মার্কিন বাজারে ২০৫ কোটি ডলার বেশি রপ্তানির সুযোগ

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৫-০৮-৩০ ২০:৩৭:২৭


চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য মার্কিন বাজারে ২০৫ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের ওপরে বাংলাদেশের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি শুল্কারোপ করায় ১২০ থেকে ২০৭ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর চীনের ওপরে বেশি শুল্কারোপ করার কারণে সাত থেকে পঁচিশ মিলিয়ন ডলার বেশি রপ্তানি হতে পারে মার্কিন বাজারে।

গতকাল সকাল ১১ টায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত মোয়াজ্জেম হোসেন স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। ‘সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ’ বিষয়ে আলোচনায় প্রথমে সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা ও এর বিশ্লেষন তুলে ধরেন। পরে অর্থনীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।

সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা

সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে এর বিশ্লেষণ করেন ড. জাহিদ হোসেন। সামষ্টিক অর্থনীতির তিনটি দিক তুলে ধরেন তিনি। এসব দিকের মধ্যে রয়েছে স্থিতিশীলতা, কর্মচাঞ্চল্যতা ও জনকল্যাণ।

স্থিতিশীলতার দিক থেকে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ অর্থবছরে মূল্যষ্ফীতি ছিল ৯.৭২ এটা ২০২৫ এর জুলাইয়ে কমে ৮.৫৫ হয়েছে অর্থাৎ মূর‌্যস্ফীতি কমেছে। খাদ্য মূল্যষ্ফীতি ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ১০.৪ এখন দাঁড়িয়েছে ৭.৫ এখানেও মূল্যষ্ফীতি কমেছে। খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ৯.১৫ চলতি বছরের জুলাইয়ে সেটা বেড়ে হয়েছে ৯.৩৮ অর্থাৎ এখানে কোন উন্নতি হয়নি। আমাদের টাকার মূল্যের পতন ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ১১.৩ শতাংশ। ২০২৫ এ সেটা নেমে গিয়ে ৪.১ শতাংশ হয়েছে। এখানে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রিজার্ভ ২০২৪ সালে ছিল ২১.৭ বিলিয়ন, এখন ২৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। খেলাপি ঋণ ২০২৪ অর্থবছরের জুনে ছিল ৩১.৪৫ লাখ কোটি টাকা। অর্থবছর ২০২৫ এর মার্চের শেষে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। সার্বিকভাবে স্থিতিশীলতার দিক থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ এর অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তিদায়ক। শতভাগ নয় কিন্তু স্বস্তি বেড়েছে।

অর্থনীতির কর্মচাঞ্চল্যের দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থনীতির কর্মচাঞ্চল্য বা এক্টিভিটির দিক থেকে সবচেয়ে বড় সূচক হচ্ছে জিডিপির প্রবৃদ্ধি। অর্থবছর ২০২৪ এ ছিল ৪.২ আর ২০২৫ এটা ৪ শতাংশের নিচে চলে এসেছে অর্থাৎ এখানে উন্নতির কোন লক্ষণ নাই। মাথাপিছু আয় ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২৭৩৮ ডলার আর চলতি অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২৮২০ ডলার। মোট রপ্তানী ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ৪০.৮ বিলিয়ন ডলার আর ২০২৫ এ এসে হয়েছে ৪৩.৯৫ বিলিয়ন ডলার। তার মানে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। রেমিট্যান্স ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের মতো। ২০২৫ সালে এসে এটা ৩০ বিলিয়নের উপরে উঠে গেছে। কাজেই রেমিট্যান্স এবং রপ্তানীর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ অর্থবছরে ৩০.৭ শতাংশ জিডিপিতে বিনিয়োগ হয়েছিল। সেটা নেমে ২০২৫ এ ২৯.৩৮ শতাংশ হয়েছে। এখানে অবনতি ঘটেছে। মূলত এই অবনতি ঘটেছে ব্যক্তি খাতে। এখানে ২৩.৯ থেকে নেমে ২২.৫ হয়েছে। বিবিএসের হিসাবে সরকারী বিনিয়োগ গত বছরে ছিল ৬.৭ এবছরে এটা ৬.৯ হয়েছে। তবে এটাকে খুব গুরুত্ব দেওয়ার মতো বলে মনে করেননা তিনি। কর্মসংস্থানের হার অর্থাৎ কর্মযোগ্য মানুষের যে সংখ্যা যেটা ১০ কোটির মতো। এর মধ্যে কত শতাংশ কর্মরত সেটা গত অর্থবছরে ছিল ৫৮.৩ এবং ২৫ এর প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ মার্চের শেষের দিকে এটা নেমে ৫৫.৯ হয়েছে। এখানে অবনতি ঘটেছে। মজুরীর ক্ষেত্রে প্রকৃত মজুরী বৃদ্ধির হার ছিল ২ শতাংশ। মানে প্রকৃত মজুরী ২০২৪ এ ২ শতাংশ কমেছিল। চলতি বছরে সেই কমার গতি কমেছে কিন্তু এখনও ঋণাত্মক ০.৩ শতাংশ। সার্বিকভাবে রেমিট্যান্স, মাথাপিছু আয় আর রপ্তানীকে যদি বাদ দেওয়া হয় তাহলে দেখা যায় যে কর্মচাঞ্চল্যতার দিক থেকে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোন উন্নতি হয়নি বরং বেশ কিছু সূচকে নিম্নগামী প্রবণতা লক্ষনীয়।

জনকল্যাণের দিক থেকে অর্থনীতির অবস্থার বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপের কয়েকটি সূচক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এক্ষেত্রে ২০২২ সালের সাথে তুলনা করতে হবে। কারণ, তার পর থেকে আর পরিসংখ্যান নাই। পিপিআরসির জরিপ অনুযায়ী ২০২২ সালে হতদরিদ্রতার হার ছিল ৫.৬ শতাংশ বা ৬ শতাংশের কাছাকাছি, সেটা পিপিআরসির হিসাবে উঠে গেছে ৯.৩৫ এ বা হতদরিদ্রতা বেড়ে গেছে।

দারিদ্রসীমার উপরে এবং দারিদ্রসীমার নিচে যারা আছেন তাদের মাঝামাঝি যারা আছেন তাদেরকে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলা হয় মডারেট দরিদ্র। এটা ২০২২ অর্থবছরে ১৩.১ শতাংশ ছিল। পিপিআরসির জরিপ যেটা ১ থেকে ১৭ জুনের মধ্যে করা হয়েছিল সেখানে এটা বেড়ে গিয়ে ১৮.৫৮ হয়েছে। অর্থাৎ হতদরিদ্রতাও বেড়েছে, মডারেট দরিদ্রতাও বেড়েছে। ভালনারেবল দরিদ্র অর্থাৎ যারা দ্ররিদ্র না কিন্তু দারিদ্রসীমার খুব বেশি উপরেও না। একটা ধাক্কা খেলেই যারা দারিদ্রসীমার নিচে চলে যাবে এমন মানুষের সংখ্যা ১৭.৯৭ শতাংশ। পরিবারের একজন বা তার বেশি সংখ্যক সদস্যের দূররাগ্য রোগ আছে এমন পরিবারের সংখ্যা পিপিআরসির হিসাবে ৫২ শতাংশ। এই জরিপে হয়রানির মাত্রা অর্থাৎ ৭৪.৬ শতাংশ উঠে এসেছে। বৈষম্যের হিসাব যেটা ০.৩৩ ছিল সেটা বেড়ে দশমিক ৪ এ উঠেছে। এটা অনেক বড় ব্যবধান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সার্বিকভাবে স্থিতিশীলতায় ভালো করেছে। কর্মচাঞ্চল্যের দিক থেকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানী বাদ দিলে খুব বেশি উন্নতি করতে পারেনি। ম্যাক্রো পর্যায়ে কিছুটা যে চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে মাইক্রো পর্যায়ে সেটা ততটা লক্ষণীয় নয়। এ পর্যায়ে দূর্দশা বেড়ে গেছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে দারিদ্রতাও বাড়ছে এটাকেই মধ্যম আয়ের ফাঁদ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে আয় বাড়ছে কিন্তু ব্যষ্টিক অর্থনীতিতে এ প্রভাব বেড়ে গেছে এমন পরিস্থিতিকে মধ্যম আয়ের ফাঁদ না বলে কোনটাকে বলা যায় বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণ

অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা ফিরেছে তার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার পেছনে যারা ছিলেন তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। দেশ থেকে অর্থপাচার বন্ধ হয়েছে। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার কমে গেছে, বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে। অন্যদিকে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থার উন্নতি না হলেও ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ হয়েছে। তবে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে।

ড. জাহিদ বলেন, এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পক্ষে গেছে। বিশেষকরে ডলারের দাম কমে যাওয়া উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে ড. জাহিদ বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই যে সংস্কার হবে তার নিশ্চয়তা নেই। সংস্কার করার জন্য রিফর্ম ডেলিভারি ক্যাপাসিটি থাকতে হবে। এক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ, প্রশাসন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের যৌথ বা সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এই চারটি পক্ষ যৌথভাবে কাজ না করলে সংস্কার আটকে যাবে বলে জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মাহবুবুর রহমান। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

বিএইচ