শিল্পায়নে যাচ্ছে না পুঁজিবাজারের পুঁজি

::জাকির হোসাইন প্রকাশ: ২০২৫-১০-০৭ ১৬:৫৭:৪১


দেশের শিল্প, উৎপাদন খাত ও ব্যবসা সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হলো পুঁজিবাজার। সারা পৃথিবীতেই স্বল্পমেয়াদি ঋণের জন্য ঋণ দেয় ব্যাংক খাত আর উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মূলধনের যোগান দেয় পুঁজিবাজার। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের সুযোগ পায়। তবে আমাদের দেশের পুঁজিবাজার শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারেনি। বরং পূর্বের নানামুখী অনিয়ম এবং নীতি ব্যর্থতায় নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে অর্থনীতির এই উল্লেখযোগ্য খাত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য। ব্যাংক খাত যেমন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তেমনি পুঁজিবাজারও আরেকটি অংশ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য দুটি অংশই সচল এবং শক্তিশালী থাকা জরুরী।

বর্তমান বাস্তবতা

শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ পুঁজিবাজার থেকে হওয়ার কথা হলেও দেশের পুঁজিবাজারের চিত্র ভিন্ন। দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এখানে ব্যাংক নির্ভর কর্পোরেট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যেখানে স্বল্প মেয়াদী ঋণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী ঋণেও একমাত্র ভরসা ব্যাংক। এমনকি বড় বড় সরকারী প্রকল্পও গড়ে উঠেছে ব্যাংক ঋণে। ফলে একদিকে যেমন পুঁজিবাজার নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে তেমনি বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের ভারে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতের উপর অতি নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতির একটি মিসম্যাচ। এই ব্যাংক নির্ভর কর্পোরেট সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজারকেও শক্তিশালী করতে হবে।

আইপিওহীনতার সংকট

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সচল থাকে পুঁজিবাজার। এই তালিকাভুক্তি বা শেয়ার ইস্যু করার মাধ্যম হলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও। কিন্তু দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রয়েছে এই প্রক্রিয়া। মূলত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) থেকেই আইপিও সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দেশের পুঁজিবাজারে কোনো আইপিও আসেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রত্যেক অর্থবছরেই কোন না কোন আইপিও এসেছে। কিন্তু গত প্রায় ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোন আইপিও আসেনি। এতো দীর্ঘ সময়ে আইপিও না আসা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের জন্য আইপিও অনুমোদন পায় টেকনো ড্রাগস। আর ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর আইপিও পায় এনআরবি ব্যাংক।

এর আগে বিগত পাঁচ বছরে মোট ৫২টি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা তুলেছে। এতে গড়ে প্রতি অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার তহবিল বাজার থেকে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র চারটি কোম্পানি ৩২৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে ১৫টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা তুলতে সক্ষম হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে একই সংখ্যক অর্থাৎ ১৫টি কোম্পানি সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও নয়টি কোম্পানি ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।

পূর্বের অনিয়ম ও নীতিগত দুর্বলতা অন্যতম কারণ

দেশের পুঁজিবাজার ঘিরে পূর্বে নানান অনিয়ম ও কারসাজি সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় যেমন রাজনৈতিক যোগসাজস ছিল পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এসকল অনিয়ম ও কারসাজি প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে বাজারে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা। সেইসাথে যুক্ত হয়েছে নীতি ব্যর্থতা। এসব কারণে দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্খিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে দীর্ঘদিন ঘরে বাজারে নতুন কোন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে না।

মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মাজেদা খাতুন বলেন, উদ্যোক্তারা হয়তো আসতে পারছে না, কারণ তারা হয়তো মনে করছে তাদের ট্যাক্স গ্যাপটা কম ও আইপিও বিধিমালাও আপডেট হওয়া দরকার। সেইসাথে নির্বাচন এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিষয় তো আছে। হয়তো তারা সামনের দিনগুলোতে আসবে, সময় নিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, দেশে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে ইনসেন্টিভ পর্যাপ্ত নয়। একটা সময়ে ইনসেন্টিভ কিছু ছিল সেটা অনেক আগে। এখন থেকে ১০ থেকে ১৫ বছর আগে তালিকাভুক্ত হলে ১০ শতাংশ কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স কম ছিল। সেটা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করতে করতে গত বছর ৫ শতাংশে এসেছিল। এবার বাজেটে সেটা সাড়ে সাত শতাংশ করেছে। মানে তলিকাভুক্ত হলে তারা সাড়ে সাত শতাংশ কর্পোরেট ইনকাম ট্যাক্স কম দেবে। কিন্তু এসব কোম্পানিকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তারা বলবে যে আমরা ওই সাড়ে সাত শতাংশের জন্য মাথা ঘামাই না। অথচ এসব কোম্পানি অন্যান্য দেশে তালিকাভুক্ত। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই কোম্পানি চলছে কিন্তু শুধু বাংলাদেশের তারা তালিকাভুক্ত না। এক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত না হলে বেশি পরিমাণ করের শর্ত আরোপের বিধান করার পরামর্শ দেন তিনি।

অর্থনীতিতে প্রভাব

পুঁজিবাজার থেকে শিল্প ও উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত মূলধন প্রবাহিত না হওয়ায় অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য যেখানে পুঁজিবাজার অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ার কথা, সেখানে বাস্তবে অধিকাংশ কোম্পানি নির্ভর করছে ব্যাংক ঋণের ওপর। ফলে একদিকে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পুঁজিবাজার তার প্রকৃত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর ফলে শিল্পায়নে আসছে না গতি, তৈরি হচ্ছে না নতুন কর্মসংস্থান। এতে সামগ্রীক টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাজার মূলধন, জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ, এসব দিক থেকে এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারের দিক থেকে এশিয়ার মধ্যে নবম বৃহৎ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেখানে পুঁজিবাজার এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে অনেকাংশেই পিছিয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনমুখী ও নতুন শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগ না হলে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব নয়। পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে না পারলে অর্থনীতিতে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এছাড়াও আসন্ন এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অবদান রাখতে পারতো বলে মনে করেন অধ্যাপক আবু আহমেদ। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি অনেক আগে আসা উচিত ছিল; দেশীয় ভালো কোম্পানি, বহুজাতিক কোম্পানি যেগুলা এখনো স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে আছে। সরকারেরও কিছু কোম্পানি আছে লাভজনক, সেগুলা এতদিনে এসে যাওয়া উচিত ছিল। সবকিছু মিলে পুঁজিবাজার যেখানে থাকা উচিত ছিল সেটা হয়ে উঠেনি।

তিনি বলেন, এখন অনেক ব্যাংকে লক্ষ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি আছে তা হতো না। সারা পৃথিবীতে বিজনেস হাউজগুলো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য শেয়ার বাজারে যায়। এই বাংলাদেশে ট্রেডিশনালি ও ব্যাংকে যায়। এজন্যই ব্যাংকগুলোও দেউলিয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ।

শিল্প উদ্যোক্তা নাজমুল হক বলেন, শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন নিতে হবে। এতে শিল্পায়ন ও ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ হবে। শিল্পায়ন বাড়লে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। এতে সার্বিক অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও গতিশীল করতে হলে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থার বাইরে এসে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নীতিগতভাবে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হলে শিল্পায়ন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম উৎস হতে পারে দেশের পুঁজিবাজার।

তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতি দ্রুত পুঁজিবাজারে নীতি-প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য আইপিও প্রক্রিয়া সহজ ও সঠিক ভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়ন করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

এএ