পুঁজিবাজারের স্থবিরতায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো অস্তিত্ব সংকটে

::জাকির হোসাইন আপডেট: ২০২৫-১০-১৪ ১৯:২৮:২৬


দেশের পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন মার্চেন্ট ব্যাংক। নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও পরিচালনা ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূলধন গঠনে বড় ভূমিকা রাখে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। বাজারে চলমান স্থবিরতা, আয়ের পথ সংকুচিত হওয়া ও নেগেটিভ ইক্যুইটির বোঝায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অস্তিত্ব সংকটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতি দ্রুত বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, পুঁজিবাজার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ পুরো অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা

মার্চেন্ট ব্যাংক পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন, যারা কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। তারা নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনা, পুঁজি সংগ্রহে সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সচল রাখে। চাহিদা এবং যোগান উভয় দিকে কাজ করে মার্চেন্ট ব্যাংক। চাহিদার দিক থেকে তারা কোম্পানিগুলোর জন্য কাজ করে। যেমন আইপিও পরিচালনা, প্রস্পেক্টাস প্রস্তুত, আন্ডাররাইটিং, করপোরেট অ্যাডভাইজরি ও প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করা।

অন্যদিকে যোগানের দিক থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য কাজ করে থাকে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা (পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট), বাজার গবেষণা, বিনিয়োগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও বিনিয়োগ পরামর্শ প্রদান। এছাড়াও কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগের আগে আইনগত, আর্থিক ও কার্যকরী যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে থাকে মার্চেন্ট ব্যাংক।

বর্তমান বাস্তবতা

বলা হয়ে থাকে মার্চেন্ট ব্যাংক নতুন নতুন আইপিও আনার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তারল্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। তবে পুঁজিবাজারের চলমান অবস্থায় তারল্য সরবরাহের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেই সংকটের মুখে পড়েছে। নতুন আইপিও না আসায় তাদের প্রধান আয়ের উৎস অর্থাৎ ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ও আন্ডাররাইটিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বাজারের সার্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা থেকেও পর্যাপ্ত আয় আসছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, এই অবস্থায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো মূলত তাদের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এবং কিছু পোর্টফোলিও ম্যানেজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে টিকে আছে। আরেক মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জনবল কমানোর মাধ্যমে ব্যয় সংকোচন নীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন বলে জানান।

বন্ধ নতুন ইস্যু, রুদ্ধ মূল আয়ের পথ

গত বছরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাতেও পরিবর্তন ঘটে। বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল পূর্বের অনিয়ম বন্ধের পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বের পদক্ষেপে বাজারে সুশাসন ও গতি ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। গত প্রায় দেড় বছর থেকে বাজারে নতুন কোন আইপিও আসেনি। এতে বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা। বিশেষ করে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মূল কাজের মধ্যে রয়েছে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট। ফলে আইপিও প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান।

অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪ টি আইপিও অনুমোদন করেছে দেশটির সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড (এসইবিআই)। ভারতের মার্চেন্ট ব্যাংকার্সদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার্স অব ইন্ডিয়ার (এআইবিআই) তথ্য বলছে, দেশটির বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (এসইবিআই) ৩৪টি আইপিও অনুমোদন দিয়েছে, যার মোট মূল্য ৪১ হাজার ৪৬২ কোটি রুপি। আরও ৫৫টির খসড়া রেড হেরিং প্রসপেক্টাস বিবেচনাধীন রয়েছে, যেগুলোর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৯৮ হাজার ৬৭২ কোটি রুপি। সংগঠনটি বলছে, এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থা এবং কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ উভয় দিককেই প্রতিফলিত করে।

একইসাথে সংস্থাটির ভাষ্যমতে, দেশটিতে খুদ্র বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। যা শক্তিশালী ডিজিটাল অনবোর্ডিং, আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক আইপিও থেকে পাওয়া ভালো মুনাফার ফলে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
প্রতিবেশী আরেক দেশ পাকিস্তানে ২০২৪ সালে ৭ টি আইপিও অনুমোদন পেয়েছে। এসব কোম্পানি দেশটির পুঁজিবাজার থেকে ৮.৪ বিলিয়ন রুপি উত্তোলণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত এক বছর থেকেই আইপিও আসা বন্ধ রয়েছে। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে।

মার্চেন্ট ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের এই মন্দাভাবে সবাই খারাপ অবস্থায় আছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎসই ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ও আন্ডাররাইটিং।

সংখ্যায় বেশি, গুণগত মানে পিছিয়ে

দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের আকারের তুলনায় সংশ্লিষ্ট অংশীজন বেশি। দেশে বর্তমানে ৪৫৬টি স্টক ব্রোকারেজ, ৬৬ টি মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ৬৭ টি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি রয়েছে। এই সংখ্যা ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। একদিকে অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদান ও আকারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশগুলো থেকে পিছিয়ে। বিপরীতে দেশে বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এসব দেশের তুলনায় বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানকে মনিটরিং করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর গুণগত মান ও সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট সেবা দেওয়া এসকল প্রতিষ্ঠানে রিসার্চ টিম থাকার কথা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের আলাদা গবেষণা দল থাকে। তবে আমাদের দেশের মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আলাদা গবেষণা শাখা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স মেনে চলে এমন হাতে গোনা ৮ থেকে ১০ টি প্রতিষ্ঠানে পৃথক গবেষণা টিম রয়েছে।

রয়েছে নেগেটিভ ইক্যুইটি ও দক্ষ জনবলের সংকট

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আরেকটি প্রকট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নেগেটিভ ইক্যুইটি। বাজার সংশ্লিষ্টরা একে ক্যান্সার হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ২০১০ সালের আকস্মিক বড় পতনের পর থেকে এই সমস্যায় ভূগছে মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাদে পুঁজিবাজারের সদস্যভুক্ত বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মোট নেগেটিভ ইক্যুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। দীর্ঘ সময়ে পুঞ্জীভূত বিপুল পরিমাণ নেগেটিভ ইক্যুইটি সহজেই দূর করা সম্ভব নয়। তাই এই নেগেটিভ ইক্যুইটির বোঝা নিয়ে আরও কয়েক বছর চলতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এছাড়াও এই খাতে দক্ষ জনবলের সংকটও রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যয় সংকোচন করতে কর্মী ছাঁটাই করেছে তেমনি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দক্ষ কর্মীরাও এই খাতে আসতে অনিচ্ছুক। এতে ভবিষ্যতে দক্ষ জনবলের সংকটের আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

দেশের শীর্ষ মার্চেন্ট ব্যাংকার প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আবুল আহসান আহমেদ বলেন, আমাদের পুঁজিবাজার স্থিতিশীল নয় এবং দীর্ঘসময় ধরে এই খাত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। একারণে পুঁজিবাজারের উপরে যেমন মানুষের আস্থা কমে গেছে তেমনি এই খাতে যারা কর্মরত আছেন তাঁরাও নিরাপত্তা বোধ করেন না। তাঁরা যখন ভিন্ন কোন ভালো সুযোগ পাচ্ছেন সেখানে চলে যাচ্ছেন। এজন্য দক্ষ জনবল ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাতে দক্ষ জনবলের সংকট প্রকট হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

খাত সংশ্লিষ্টের ব্যক্তব্য

মার্চেন্ট ব্যাংকের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) মহাসচিব ও সন্ধানী লাইফ ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, মার্কেটে এখন সাপ্লাইটা বন্ধ। প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো আইপিও নাই। ওখান থেকে আমাদের ফি আসা বন্ধ। আইপিও নাই যেহেতু, আইপিওর ইস্যু ম্যানেজমেন্ট ফি নাই। আবার আইপিও না হলে আন্ডাররাইটিং হচ্ছে না।

তারল্য প্রবাহ বাড়লে অনেক ধরনের বিজনেস হয় জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের দিকে মার্কেটটা একটু ভালো ছিল। আমরা একটা খুব আশা দেখছিলাম যে হয়তোবা ভলিউম ভালো হবে। ভলিউমটা ভালো হলে তারল্য প্রবাহটা বাড়বে। কিন্তু এর মধ্যেই আবার মার্কেটটা কন্টিনিয়াসলি ডাউন মোডে আছে।

নির্বাচনের পরে একটা ভালো পরিবেশ আসবে আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সাপ্লাই চেইনটাকে আসলে ঠিক করতে হবে, যেকোনভাবে হোক আইপিও দিতে হবে। এর মধ্যে ভালো আইপিও আসবে খারাপ আইপিও আসবে। যতটুক পারা যায় সেটাকে ফিল্টারিং করে কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করা যায় সেটার জন্য ট্রাই করতে হবে। এখন মাথা ব্যথা হলে মাথা তো কাটা যাবে না।

দেশের পুঁজিবাজারে মার্চেন্ট ব্যাংক খাত একসময় বিনিয়োগের প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করত। কিন্তু নতুন ইস্যুর অভাব, নেগেটিভ ইক্যুইটি এবং বাজারের সার্বিক স্থবিরতার কারণে এখন তারা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। তাই এই খাতসহ সার্বিক পুঁজিবাজারের উন্নতির জন্য বাজারে যোগান বাড়ানো এবং স্বচ্ছ নীতিমালা ও সুশাসন নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এএ